মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
বর্ষার নতুন পানিতে প্রাণ ফিরেছে নরসুন্দায়, মাছ ধরায় মেতেছে শিশু-কিশোররা
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৩:৪৭ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

আষাঢ়ের টানা বর্ষণে প্রাণ ফিরে পেয়েছে কিশোরগঞ্জের নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়। কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার ঐতিহ্যবাহী নরসুন্দা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন পানির স্রোতের সঙ্গে নদী থেকে বিভিন্ন খাল, বিল, ডোবা ও নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। আর সেই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে ফিরে এসেছে বহুদিনের চিরচেনা গ্রামীণ উৎসবের আমেজ। শিশু-কিশোর, তরুণ, যুবক থেকে শুরু করে প্রবীণরাও জাল-বড়শি হাতে নেমেছেন মাছ ধরার আনন্দে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের স্বল্প যশোদল নধার এলাকার নরসুন্দা নদী ও আশপাশের জলাশয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীর ও ডোবার পাশে মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। একঝাঁক শিশু-কিশোর ঝাঁকি জাল, খরা জাল, ঠেলা জাল, ফাঁচা, ডারকি ও বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত। কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে জাল ফেলছে, কেউ পানির স্রোতের মুখে ফাঁচা বসিয়ে অপেক্ষা করছে, আবার কেউ নদীর পাড়ে কিংবা ডোবার ধারে বড়শিতে টোপ লাগিয়ে মাছ ধরছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে নরসুন্দা নদীর পানি বিভিন্ন সংযোগ খাল ও নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। নতুন পানির সঙ্গে নদীর মাছও ছড়িয়ে পড়েছে এসব জলাশয়ে। ফলে শুধু পেশাদার জেলেরাই নন, সাধারণ মানুষও মাছ ধরায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদী ও ডোবার আশপাশে শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে। গ্রামীণ জীবনের এই দৃশ্য যেন বর্ষার এক চিরন্তন ঐতিহ্য। একদিকে ঝুম বৃষ্টি, অন্যদিকে নদীর নতুন পানি, চারপাশে সবুজ প্রকৃতি আর শিশুদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে শুরু হয়েছে মাছ ধরার এই উৎসব।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষার শুরুতেই নদী থেকে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ খাল-বিল ও ডোবায় চলে আসে। তখন মাছ ধরা অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই প্রতিবছর বর্ষা এলেই এলাকার মানুষ জাল-বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়েন। শিশু-কিশোরদের কাছে এটি শুধু মাছ ধরা নয়, বরং একটি আনন্দঘন মৌসুমি আয়োজন। বর্ষার নতুন পানিতে এবার পুঁটি, টেংরা, ডারকা, চোপরা, গড়াই, মোয়া, চিংড়ি, কৈ, মাগুর, শিং, খলশে, টাকি, বেলে, গজারসহ নানা ধরনের দেশীয় মাছ দেখা যাচ্ছে। এসব মাছ স্থানীয় মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কিছুটা ভূমিকা রাখে।

শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকেই তারা পানিতে মাছের চলাচল দেখতে পায়। এরপর বিকেলে দল বেঁধে মাছ ধরতে নামে। বড়শির টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে পাউরুটি, আটা ও কেঁচো। কেউ কেউ ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত পুঁটি মাছ ধরেছে। মাঝে মধ্যেই বড়শিতে টেংরা মাছও ধরা পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সালিম হোসেন বলেন, ‘বিকেলে বাচ্চাদের মাছ ধরতে দেখে আমিও সেখানে যাই। বর্ষার নতুন পানি জমেছে। নদী থেকে অনেক দেশীয় মাছও এসেছে। বাচ্চারা খুব আনন্দ করে মাছ ধরছে। এমন দৃশ্য এখন খুব একটা দেখা যায় না। এটা আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ।’

স্থানীয় প্রবীণ আবু বক্কর বলেন, ‘আগে বর্ষা এলেই গ্রামের প্রায় প্রতিটি খাল-বিল ও জলাশয়ে মানুষ মাছ ধরতে নামত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই কমে গেছে। তবে নতুন পানি এলে এখনও শিশু-কিশোরদের মাছ ধরার আনন্দ দেখে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা খুবই প্রয়োজন।’

বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে আসা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, ‘সকালে নদীতে ছোট ছোট মাছ দেখতে পাই। বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে জাল আর বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে এসেছি। বেশ কয়েকটি পুঁটি মাছ পেয়েছি। বর্ষার সময় এভাবে মাছ ধরতে খুব ভালো লাগে। স্কুল ছুটি থাকলে প্রায়ই আসি।’

খরা জাল দিয়ে মাছ ধরতে আসা কিশোর রাব্বি বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই নদী ও ডোবায় নতুন পানি আসে। তখন মাছও অনেক পাওয়া যায়। আমরা প্রায় প্রতি বিকেলেই মাছ ধরতে আসি। আজ টেংরা আর পুঁটি মাছ ধরেছি। বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে খুব মজা লাগে।’

স্থানীয় যুবক রাসেল বলেন, ‘এটা শুধু মাছ ধরা নয়, আমাদের কাছে একটা আনন্দের বিষয়। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতির মধ্যে থাকা আর নিজের হাতে মাছ ধরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে বর্ষার এই সময়টা অন্যরকম ভালো লাগে।’

ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরতে আসা মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘আগে বর্ষা এলেই গ্রামের সবাই মাছ ধরতে নামত। এখনও নতুন পানি এলে সেই পুরোনো দৃশ্য দেখা যায়। শিশু-কিশোরদের এভাবে মাছ ধরতে দেখে খুব ভালো লাগে। এটা আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, যা হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।’

কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আষাঢ় মাসে বৃষ্টির কারণে নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওরে নতুন পানি আসে। এ সময় দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ প্রজননের জন্য স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন জলাশয়ে চলাচল করে। মানুষ মাছ ধরবে, এটা স্বাভাবিক। তবে আমাদের অনুরোধ, মাছগুলো যেন প্রজননের সুযোগ পায়। প্রজনন শেষে মাছ আহরণ করলে মাছের বংশবৃদ্ধি হবে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনও বাড়বে।’

তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ জাল ও নিষিদ্ধ মাছ ধরার সরঞ্জাম সারা বছরই নিষিদ্ধ। এছাড়া সরকার গত বছর থেকে হাওর অঞ্চলে প্রতি বছর ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত এক মাস দেশীয় প্রজাতির মাছ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কারণ এই সময়টাতেই অধিকাংশ দেশীয় মাছ ডিম ছাড়ে ও প্রজনন করে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের সময় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, তবুও এই সময় মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু অভিযান নয়, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ঈদের আগেই জেলার প্রতিটি উপজেলায় লিফলেট বিতরণ, হাট-বাজার, আড়ত ও জেলেপল্লীতে প্রচারণা, দুই দিন করে মাইকিং এবং বিভিন্ন স্থানে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদেরও অনুরোধ করা হয়েছে, তারা যেন এই সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন। এতে মাছ নিরাপদে প্রজনন করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।”

তিনি বলেন, “ঈদের পর থেকে প্রশাসনের সহযোগিতায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চলছে। এ সময় নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হচ্ছে। ২৮ জুন পর্যন্ত দেশীয় মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ সরঞ্জামের বিরুদ্ধে অভিযান সারা বছরই অব্যাহত থাকবে।”

বর্ষা যত এগোবে, ততই নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় মাছের বিচরণও আরও বাড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের বিশ্বাস, আগামী কয়েক সপ্তাহজুড়ে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে মাছ ধরার এমন উৎসবমুখর পরিবেশ অব্যাহত থাকবে, যা গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলবে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close