কথিত বাংলাদেশি বলে নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে (পুশইন) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সীমান্তসংলগ্ন বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিরোধে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে তারা। তারপরও ঠান্ডা মাথায় একের পর এক নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে তারা।
কখনো রাতে, কখনো ভোরে, কখনো টাকার প্রলোভন দিয়ে বা নারী-শিশুদের সামনে রেখে পুশইন চেষ্টা চালাচ্ছে বিএসএসফ। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে কোনোভাবেই এএসএফ সফল হচ্ছে না। এর মধ্যেও গতকাল বুধবার নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৬ দিনে চার দফা প্রতিরোধ:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে মাত্র ১৬ দিনে চার দফায় পুশইনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। তবে প্রতিবারই বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। পুশইন সফল করতে বিএসএফ ভৌগোলিক অবস্থান, বৈরী আবহাওয়া ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
নজরদারি এড়াতে পুশইনের জন্য গভীর রাত কিংবা ভোরবেলাকে বেছে নেওয়া হয়। স্থলসীমান্তে বিজিবির কড়া অবস্থানের মুখে রুট পরিবর্তন করে নদীপথ বেছে নেয় বিএসএফ। রোকনপুরের নদী সীমান্ত দিয়ে নৌকাযোগে পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হয়। অর্থের বিনিময়ে এই কাজে বিএসএফকে সহায়তা করে স্থানীয় কিছু দালাল ও মাঝি।
বিএসএফের একটি বড় কৌশল ছিল বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়া মানুষের দলে অধিকসংখ্যক নারী ও শিশু রাখা। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের ওপর একধরনের মানবিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। উদ্দেশ্য ছিল নারী ও শিশুদের সামনে দেখে বিজিবি যেন কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে।
এছাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় বিজিবি বাধা দিলে বিভিন্ন পোস্টে সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায় বিএসএফ। এটি ছিল বিজিবিকে ভয় দেখানো ও চাপে ফেলার কৌশল। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের এসব কৌশল কাজে আসেনি।
গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে গত ৪ জুন ভোররাত ৩টার দিকে ১২ পুরুষ, ১০ নারী এবং ছয় শিশুসহ মোট ২৮ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে সীমান্তের শূন্যরেখায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর বিজিবি ও স্থানীয়দের শক্ত অবস্থানের মুখে পরদিন তাদের ভারতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
একই উপজেলার রোকনপুর সীমান্তের নদীপথে গত ১২ জুন রাত ১২টা ৪০ মিনিটে নৌকাযোগে দুই পুরুষ, আট নারী এবং পাঁচ শিশুসহ ১৫ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে বাধা দেয় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা। প্রায় দুই ঘণ্টা শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকার পর রাত ২টা ৪০ মিনিটে তাদের ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ।
ব্ল্যাক আউট করে পুশইনের চেষ্টা:
১৫ জুন রাত পৌনে ১১টার দিকে একই সীমান্ত দিয়ে এক নারীকে নৌকাযোগে পুশ-ইনের চেষ্টা স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিহত করে বিজিবি। পরবর্তীতে শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্ত দিয়ে গত ২০ জুন ভোরে পাঁচ পুরুষ, ১১ নারী ও চার শিশুসহ ২০ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ।
বিষয়টি টের পেয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠে নামেন গ্রামবাসী। শেষ পর্যন্ত বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের ওই পুশ-ইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে আর প্রবেশ করতে পারেনি অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা।
দালাল চক্রের সাতজন আটক:
গত ১৫ জুনের ঘটনায় বিএসএফকে সহযোগিতার অভিযোগে স্থানীয় চার দালালসহ সাত বাংলাদেশিকে আটক করে পুলিশ ও বিজিবি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে আটককৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
৫৯-বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্ত দিয়ে পুশইন কোনোভাবেই হতে দেওয়া হবে না। বিএসএফের যেকোনো চতুর কৌশল নস্যাৎ করতে বিজিবি সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি ও সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রয়েছে।
১৬-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, এই ব্যাটালিয়নের আওতাধীন এলাকায় তিনবার পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হয়। বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে বিএসএফের প্রতিটি চেষ্টাই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
১৩ ঘণ্টা ধরে শূন্যরেখায় ৯ জনের মানবেতর জীবন:
নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ নয়জনকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। এ অবস্থায় শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন ওই নয়জন।
গতকাল বুধবার ভোরে উপজেলার আদাতলা সীমান্তের ২৪৪/এমপি সীমান্ত পিলার এলাকা দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়া হয়। শেষ খবর পর্যন্ত (১৩ ঘণ্টা) সীমান্তের খোলা আকাশের নিচে শূন্যরেখায় মানবেতর অবস্থায় আছেন তারা। বেলা আড়াইটার দিকে বিএসএফের একটি দল এসে বিজিবি সদস্যদের অনুরোধ করে, তাদের কোম্পানি কমান্ডার (সিও) বলেছেন, তারা বাংলাদেশি, তাদের যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে নেওয়া হয়। তবে বিএসএফের এই দাবিতে সাড়া না দিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
পাতাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভোররাত থেকে তারা খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। খাবার-পানি কিছুই নেই। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
নওগাঁ-১৬ বিজিবির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভোর ৪টার দিকে সাপাহার উপজেলার আদালতলা সীমান্ত চৌকির (বিওপি) আওতাধীন ২৪৪/এমপি সীমান্ত পিলার এলাকা দিয়ে ২৯-বিএসএফ ব্যাটালিয়নের এলেনপুর ক্যাম্পের সদস্যরা নয় ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইন করার চেষ্টা করে।
তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছেন। খবর পেয়ে আদালতলা বিওপির বিজিবি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করে। বর্তমানে ওই নয় ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহায়তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
নওগাঁ-১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, খবর পাওয়ার পর ওই এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ ও ৮ জুন নওগাঁর পোরশা ও সাপাহার সীমান্ত দিয়ে ৪০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনতার সতর্ক অবস্থানের কারণে তাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
দিনাজপুর সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে স্থানীয়দের হাতে আটক ৪:
দিনাজপুর সদরের শংকরপুর ইউনিয়নের বনতারা সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অভিযোগে চারজনকে আটক করেছেন এলাকাবাসী।
গতকাল বুধবার ভোর ৬টায় শংকরপুর ইউনিয়নের শালকি মৈজ্জাকুড়ি গ্রাম থেকে এলাকাবাসী তাদের আটক করেন। আটকের পরে তাদের ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ে আসা হয়। আটকদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তারা হলেন- আকুব্বর মোল্লা (৫০), মো. আব্দুর বোরহান খান (৩৬), রমজান মোল্লা (১৫) ও জাহানারা বেগম (৪৫)। তারা সবাই নড়াইল জেলার বাসিন্দা। ফুলবাড়ী ২৯-বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুজ্জামান তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শংকরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পংকজ বসাক বলেন, রাতে বনতারা গিলাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ওই চারজন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভোরে এলাকাবাসী তাদের শালকি মৈজ্জাকুড়ি গ্রামে চলাফেরা করতে দেখে সন্দেহ হলে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাদের ইউনিয়ন পরিষদে আনা হয়েছে। আমি তাদের পরিবার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। আটকরা আমাকে জানিয়েছে- তারা কাজের সন্ধানে ভারতে যায় ও ফেরত আসে। তবে তারা কীভাবে যায় ও ফেরত আসে তা তাদের পরিবার কিছু জানে না।
ফুলবাড়ী ২৯-বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুজ্জামান বলেন, তারা দক্ষিণাঞ্চল থেকে এসেছে। আমাদের সীমান্ত দিয়ে ঢোকেনি। তারা এখানে কীভাবে আসল এটা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
কেকে/ এমএস