মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মানবপাচারের অন্যতম রুট উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জনপদগুলোতে নীরবে বিস্তার ঘটছে মানবপাচারের এক উদ্বেগজনক জাল। চাকরি, মোটা বেতন কিংবা বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের টার্গেট করছে সংঘবদ্ধ চক্র। সেই স্বপ্নের টানে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া অনেকেরই ঠিকানা হচ্ছে ভারতের কারাগার।

জানা গেছে, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এখন মানবপাচারকারীদের অন্যতম রুট। সম্প্রতি ১৭ মাস কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা ৩৬ বাংলাদেশির ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পাচারকারীদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক, তাদের কৌশল এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই ভয়ংকর বাস্তবতা।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনা, মানবপাচার মামলার তথ্য ও মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের একাধিক সীমান্ত রুট এখনো মানবপাচারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, যশোরের বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসংলগ্ন সীমান্ত এলাকা এবং বিভিন্ন অরক্ষিত পয়েন্ট ব্যবহার করে লোকজনকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় দালালরা প্রথমে গ্রামের বেকার যুবকদের সংগ্রহ করে। পরে কয়েক ধাপে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাত গভীর হলে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেওয়া হয়। ওপারে আগে থেকেই অপেক্ষা করে ভারতীয় এজেন্টরা। এরপর বাস বা ট্রেনে তাদের পাঠানো হয় চেন্নাই, কেরালা, কর্ণাটক, দিল্লি কিংবা হরিয়ানার মতো দূরবর্তী অঞ্চলে।

একজন ভুক্তভোগী জানান, সীমান্ত পার হওয়ার পর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটাও জানানো হয় না। অথচ অনেককে ভুটান বা অন্য দেশে চাকরির কথা বলে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। নন্দীগ্রামের ভুক্তভোগী আতিকুল ইসলামকে বলা হয়েছিল ভুটানে চাকরি হবে। এজন্য দালালদের প্রায় ২৪ হাজার টাকা দেন তিনি।

আতিকুল বলেন, আমাকে বলা হয়েছিল ভারত হয়ে ভুটানে নিয়ে যাবে। সীমান্ত পার হওয়ার পর কয়েক দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বুঝতে পারি প্রতারণার শিকার হয়েছি। তিনি আরও বলেন, চেন্নাই সেন্ট্রাল কারাগারে প্রথমে মামলার শুনানি শেষ হতে কয়েক মাস লেগেছে। পরে সাজা ভোগের পরও ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে।

বগুড়ার নন্দীগ্রামের যুবক আব্দুল মোমিন। ভারতের কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটিয়েছেন ১৭ মাস। তিনি বলেন, যদি জানতাম এমন হবে, কোনোদিন সীমান্ত পার হতাম না। ভাগ্য বদলের আশায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলাম। কয়েক বছর কাজও করেছি। কিন্তু একদিন ভোরে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হই।

ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। রানা আহমেদ নামে আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, কারাগারে গিয়ে দেখি শুধু আমরা না, আরও অনেক বাংলাদেশি আছে। নারী, পুরুষ, শিশু সবাই। কেউ দুই বছর, কেউ পাঁচ বছর ধরে আটকে আছে। তার দাবি, চেন্নাইয়ের কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে কয়েকশ বাংলাদেশি আছে। ভাষা না জানার কারণে অনেকেই নিজেদের আইনি সহায়তা বা সমস্যার কথা ঠিকমতো জানাতে পারেননি।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারেই কয়েকশ সন্দেহভাজন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আটক আরও হাজারো বাংলাদেশির পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এসব বন্দির বড় অংশই পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়েছিল।

নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী, কাথম, ভাটগ্রাম, টেকরি, সিংড়াপাড়া ও দোহার গ্রাম ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে এসব এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক ভারতে গেছেন। অধিকাংশই কৃষিশ্রমিক বা নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য। বিদেশে ভালো আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের টার্গেট করা হয়। নন্দীগ্রামের কয়েকটি গ্রাম থেকে বিগত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক অবৈধভাবে ভারতে গেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলে যুবকদের সংগ্রহ করে। এদের মধ্যে কাদের মোল্লা ও হাফিজ নামে পরিচয় দেওয়া দালালদের এখন আর এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। তারা দুই মাসের বেশি এলাকায় থাকে না।

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী আবেদ হোসেন বলেন, পাচারকারীরা প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করে। গ্রামের পরিচিত কাউকে ব্যবহার করে। একবার রাজি হলে ভুক্তভোগীকে ধাপে ধাপে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাক্সক্ষাকেই পুঁজি করছে এসব চক্র। 

হিলি সীমান্তসংলগ্ন এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন কড়াকড়ি বেড়েছে। কিন্তু লোক পারাপারের কাজ বন্ধ হয়নি। শুধু খরচ বেড়েছে।

জানা গেছে, হালুয়াঘাট সীমান্তের কড়ইতলী ও গাবরাখালী এলাকা ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পারাপার পরিচালনা করছে। সেখানে ফিলিপ পাল এই চক্রের প্রধান হোতা। হিলি সীমান্তে কুশ বর্মন, মিজানুর রহমান ও গৌতম মন্ডলের নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। তাদের বিরুদ্ধে সীমান্ত পারাপার, আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ভুয়া পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে বেনাপোল সীমান্তের পুটখালী, গাতিপাড়া ও দৌলতপুর রুট ঘিরে অন্তত এক ডজন ছোট-বড় দালালচক্র সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার এবং রাইটস যশোরের মতো স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ও ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্যমতে, বেনাপোল সীমান্তে অন্তত ১২টি ছোট-বড় দালালচক্র বা ‘লাইনম্যান’ সক্রিয় রয়েছে। এরা মূলত নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা এবং যশোর অঞ্চল টার্গেট করে কাজ করে। মাঝে মাঝে অন্য জেলার মানুষকে পারাপার করে তারাই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে নজরদারি বাড়লেও পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একেকটি চক্রে স্থানীয় দালাল, পরিবহন সমন্বয়কারী, নিরাপদ আশ্রয়দাতা এবং ভারতীয় রিসিভারসহ একাধিক স্তরের সদস্য থাকে।

১৭ মাস পর বাড়ি ফিরে আব্দুল মোমিন এখন অন্যদের সতর্ক করছেন। তিনি বলেন, ‘যারা বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তারা বৈধ পথে যান। দালালের কথায় বিশ্বাস করবেন না। আমরা যা কষ্ট করেছি, শত্রুকেও যেন তা করতে না হয়।’ ছোট ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত আশাদুল ইসলাম বলেন, ‘টাকার লোভে মানুষ জীবন নষ্ট করছে। আমাদের গ্রামের অনেক পরিবার এই ভুলের কারণে আজও কাঁদছে।’

বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশে গেলে প্রতারণা, কারাভোগ ও মানবপাচারের ঝুঁকি থাকে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রশাসন কাজ করছে। তিনি স্বীকার করেন সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন গ্রাম পর্যায়ে দালাল চক্র ভাঙা। কারণ সীমান্তের কাঁটাতার পেরোনোর আগে কয়েক ধাপে কাজ চলে। তবে এখন ফিরে আসা যুবকদের তথ্যমতো প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

মানবপাচারের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে মামলা হলেও সীমান্তভিত্তিক দালালচক্র পুরোপুরি ভাঙা যায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছে একাধিক দালাল। তবে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কের কারণে নতুন সদস্যরা দ্রুত পুরোনোদের জায়গা দখল করছে।

জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার শাহনাজ বেগম বলেন, মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। সীমান্তে পারাপার ও বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তদন্তও চলছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দিতে অনীহা দেখানোয় প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না।

তিনি আরও বলেন, মিজানুর রহমান ও গৌতম মন্ডলের নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। তাদের বিরুদ্ধে সীমান্ত পারাপার, আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ভুয়া পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগ বেশ কয়েকটি মামলাও রয়েছে। এরা একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিল।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার জিদান আল মুসা বলেন, তার জেলার বিস্তৃণ এলাকা কাঁটাতারবিহীন অরিক্ষত রয়েছে। এসব এলাকা মূলত পাচারকারীরা ব্যবহার করে। তবে পুলিশ সবসময়ই সজাগ থাকে। চিহ্নিত অপরাধীদের ধরতে মঝে মধ্যেই অভিযান চালানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের মানবপাচার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবপাচার সংক্রান্ত শত শত মামলা তদন্তাধীন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে ৬০৫টি মানবপাচার মামলা নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৮৬টির তদন্ত বা নিষ্পত্তিমূলক অগ্রগতি হয়েছে। আর এ মামলাগুলোর মধ্যে দেড় শতাধিক মামলাই রয়েছে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। 

তার মতে, পাচারকারীরা এখন সরাসরি বিদেশে পাঠানোর কথা না বলে ভারত, নেপাল বা ভুটানে কাজের সুযোগের কথা বলে মানুষ সংগ্রহ করছে। পরে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে তাদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বিদেশে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং দ্রুত আয় করার প্রবণতাকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করায় অনেকেই সহজে প্রতারণার ফাঁদে পা দেন। 

তাদের মতে, শুধু সীমান্ত পাহারা দিয়ে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং দালালচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  মানবপাচার   রুট   উত্তরাঞ্চল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close