নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের প্রথম সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষে বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন তিনি। এ সফরে তিস্তাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী এ সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি রীতি ভেঙেছেন। তা হচ্ছে ভারতমুখিতা থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি চর্চা করেছেন। গত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো পররাষ্ট্রনীতি ছিল না। সরকারের সমস্ত নীতি আবর্তিত হতো ভারত ও দেশটির স্বার্থকে কেন্দ্র করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কার্যত ভারতের কাছে বন্দি হয়ে পড়েছিল। ভারতের পরামর্শে ঠিক হতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর বদলে যায় পরিস্থিতি। ভারত প্রশ্নে আওয়ামী লীগের যে নতজানু নীতি ছিল, সেই ধারা থেকে বের হয়ে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বর্তমান সরকার স্বতন্ত্র নীতি নিয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য খুবই জরুরি। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা ব্লকের দিকে ঝুঁকে থাকা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ রক্ষায় সব দেশের সঙ্গেই সমমর্যাদা ও সমস্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। তারা অবশ্য সতর্ক করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভারত বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকেও তারা ভালোভাবে নেয়নি। ফলে কূটনৈতিকভাবে তারা বাংলাদেশকে বিপাকে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের ভেতর নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে ভারত। অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া দেশটির উগ্রবাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় মত্ত হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতি খুব বেশি বদলায়নি। বরং সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিজ দেশের মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় মানুষ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এ তৎপরতা ঠেকিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হেনস্তার শিকার হন। প্রতিবাদে তিনি ভারতে প্রবেশ না করেই তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরে আসেন। যদিও এ বিষয়ে ভারত ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতের এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয়।
পুশইন ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে সজাগ স্থানীয়রা : বাংলাদেশ সীমান্তে অস্থিরতা তৈরিতে ভারতের বড় অস্ত্র পুশইন। বাংলাদেশি দাবি করে নিজ দেশের বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকদের ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ। এত দিন তারা নির্বিঘ্নেই এই পুশইন চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা বিএসএফের এ অপতৎপরতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয় সরকার। যার প্রভাব পড়ে সীমান্তে। বিজিবির কড়া নজরদারিতে পুশইন করতে ব্যর্থ হয় বিএসএফ।
গতকাল বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে এক শিশুসহ ৭ নারীকে পুশইন করেছে তারা। নওগাঁয় পুশইনে ব্যর্থ হয়ে নয়জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। আর স্থানীয়দের বাধার মুখে মেহেরপুরে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করেও সফল হয়নি তারা।
নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত এলাকায় নারী, পুরুষ এবং শিশুসহ নয়জনকে পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। উপজেলার আদাতলা সীমান্তের ২৪৪/এমপি সীমান্ত পিলারের উত্তর পাতাড়ি এলাকা দিয়ে নয়জনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। এদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছে। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা এই চেষ্টা অব্যাহত রাখে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে কড়া অবস্থান নেয় বিজিবি সদস্যরা।
নওগাঁ ব্যাটালিয়ন ১৬-বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, খবর পাওয়ার পর ওই স্থানে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে। রাত ১টার দিকে বিএসএফ সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের আঁধারে তারা পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার পর আর কাউকে দেখা যায়নি।
এ ছাড়া মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে স্থানীয়দের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে পুনরায় ভারতীয় সীমান্তের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয় তারা। গতকাল ভোরে উপজেলার সহড়াতলা সীমান্তে এই ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ভোরের দিকে নারী-পুরুষসহ ১০ জনকে সহড়াতলা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হয়। বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া খুলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পরে তারা সহড়াতলা গ্রামের ভেতর দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই ১০ জন আবার সীমান্তের দিকে ফিরে যায়। ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা জোরদার করেছে বিজিবি।
ভারতের অযাচিত আচরণের প্রতিবাদ : চলতি মাসের শুরুতে আইওআরএর একটি বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল জাহেদ উর রহমানের। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে তাকে যাত্রা অব্যাহত রাখতে বাধা দেওয়া হয়। ইমিগ্রেশনে অযাচিতভাবে হেনস্তা করা হয়। যদিও পরবর্তীতে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু হেনস্তার প্রতিবাদে ভারতে প্রবেশ না করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন ডা. জাহেদ উর রহমান। পরে দেশে ফিরে জাহেদ উর রহমান বলেন, এটার একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, সরকারের পক্ষ থেকে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমার মনে হয়েছে, একটা বার্তা এই দেশ ও এই দেশের বাইরে যাওয়া দরকার যে, এটা শেখ হাসিনার সরকার না। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই সরকার কখনো করবে না। সবার আগে বাংলাদেশ বলছি আমরা। সুতরাং ভারতের সঙ্গে এনগেজ করতে চাই, সমমর্যাদার ভিত্তিতে।’
পরে এ ঘটনা নিয়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যাকে ‘সন্তোষজনক নয়’ হিসেবে উল্লেখ করে ঘটনাটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, এ ঘটনায় ভারতীয় পক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা সন্তোষজনক নয়। মুখপাত্র বলেন, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আগেই যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল যে, জাহেদ উর রহমান ভারত মহাসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোর জোটের (আইওআরএ) বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। মুখপাত্র আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আগেই অবহিত করার পরও দিল্লি বিমানবন্দরে তার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক।’
কেকে/এলএ