মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ইরানের মুসলিম জোট : স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আলোচনা বারবার উঠেছে, বারবার ভেঙেছে। এ পুনরাবৃত্তির ভেতরে কোনো শক্তি এ আলোচনাকে কাজে লাগাচ্ছে এবং কার স্বার্থে তা ফিরে আসছে, তার উত্তর খুঁজতে হয় ঘটনার পেছনের ভূরাজনৈতিক বিন্যাসে। গত ২৩ জুন ইসলামাবাদে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মুসলিম দেশগুলোর একটি সমন্বিত সামরিক ও কৌশলগত জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। 

প্রথম দেখায় এটিকে পুরোনো ইসলামী ঐক্যের চর্বিতচর্বণ মনে হতে পারে, তবে সফরের পটভূমি বলছে ভিন্ন কথা। সফরের মাত্র ছয় দিন আগে, গত ১৭ জুন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বাক্ষর করেন। যেখানে রয়েছে হরমুজ প্রণালির পুনরুন্মুক্তি এবং ৬০ দিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কাঠামো। 

এ প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের সফর মূলত একটি যুদ্ধোত্তর কূটনীতির আনুষ্ঠানিক রূপ এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রতি তেহরানের কৌশলগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। প্রথমে ইরানের এ অবস্থান বুঝতে হলে আমাদেরকে তাদের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কৌশলের ইতিহাসে যেতে হবে। যেখানে ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে তেহরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক-সিরিয়ার মিলিশিয়া নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে একটি ফরোয়ার্ড ডিফেন্স বলয় গড়ে তুলেছিল; কূটনৈতিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় প্রতিরোধের অক্ষ। এ কৌশলের মূল কাজই ছিল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো আক্রমণকে ইরানের সীমান্তের বাইরে মোকাবিলা করা। 

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) হিসাবে, এ নেটওয়ার্ক সচল রাখতে ইরানের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের মুখে এই সিস্টেমে ধস নেমেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামো বিপর্যস্ত হওয়ায় ইরানের দূরবর্তী প্রতিরক্ষা দেওয়াল এখন অরক্ষিত। একই সময় হরমুজ প্রণালির অবরোধে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। 

বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরানের রাজস্বের ৪০ শতাংশই আসে জ্বালানি খাত থেকে। এ পথ বন্ধ থাকায় প্রতি মাসে তেহরানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার। এই দ্বৈত চাপের মুখে নতুন আঞ্চলিক কাঠামো খোঁজা ইরানের জন্য স্বাভাবিক। পাশাপাশি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ২.০ বা ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির যে মার্কিন তোড়জোড় চলছে, তার বিপরীতে একটি কাউন্টার অ্যালায়েন্স খাড়া করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই পেজেশকিয়ানের এই প্রস্তাব। 

এ ছাড়া পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনার আড়ালে তেহরান মূলত সময় কিনতে চাইছে, যাতে আইএইএ-র তথ্যমতে ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া যায়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) এটিকে অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক মোড় বললেও, এটি আসলে পুরোনো প্যাটার্নেরই পুনরাবৃত্তি। ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে গোপনে বেইজিং সফর করেছিলেন, যা মার্কিন-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ভিত্তি তৈরি করেছিল। 

পাঁচ দশক পর পাকিস্তান সেই একই ভূমিকায় এবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে। অবশ্য এই মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা রয়েছে। ১৯৭৯ সালে মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানি দূতাবাসই ইরানের স্বার্থ বিভাগ পরিচালনা করছে। 

এ ছাড়া একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের একটি কৌশলগত ওজন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সরাসরি চ্যানেল, যার সূত্রপাত ২০২৫ সালে কাবুলের অ্যাবে গেট হামলার অভিযুক্তকে পাকিস্তানের মাটিতে গ্রেপ্তারের পর থেকে। 

ফলস্বরূপ, পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে এসে বেসামরিক প্রশাসনকে পাশে রেখে সরাসরি সেনাপ্রধানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন; কারণ তেহরান পাকিস্তানের ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র চেনে। তবে এই মধ্যস্থতার পেছনে বেইজিংয়ের স্ট্র্যাটেজিক গ্রিন সিগন্যাল ছিল বলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন। 

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশীদার হিসেবে ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত শান্ত থাকা এবং এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত করা বেইজিংয়ের জন্য জরুরি। এতে পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে; দেশটি বর্তমানে আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট প্রোগ্রামের অধীনে আছে। ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডামের ফলে মার্কিন চাপ শিথিল হলে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়লে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই এক পদক্ষেপে ইসলামাবাদ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দুটি লক্ষ্যই অর্জন করেছে। কিন্তু পেজেশকিয়ানের প্রস্তাবিত জোটের কাঠামোগত বাধা পাহাড়সম। 

১৯৬৯ সালে গঠিত ওআইসি গত পাঁচ দশকে ফিলিস্তিন বা রোহিঙ্গা সংকটে কোনো কার্যকর যৌথ নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালের ডি-৮ বা ২০১৯ সালের কুয়ালালামপুর সম্মেলন প্রতিটিই জাতীয় স্বার্থের বিভাজনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে ৫৭টি ওআইসি সদস্যের মধ্যে ২৩টি দেশ সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তার আওতাভুক্ত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে। এই দেশগুলো ইরানের নেতৃত্বে কোনো জোটে যোগ দেবে, তা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবসম্মত মনে হয় না।

অবশ্য এখানে সবচেয়ে বড় অন্তরায় সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব। পারস্য উপসাগরের আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে এই প্রতিযোগিতার শিকড় ধর্মীয় পরিচয়ের (শিয়া-সুন্নি) চেয়ে অনেক বেশি পুরোনো এবং বাস্তববাদী। যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ-তেহরান সম্পর্ক পুনরুদ্ধার হলেও তাদের মধ্যকার কাঠামোগত প্রতিযোগিতা অব্যাহত। রিয়াদ যখন ইসরায়েলের সঙ্গে অলিখিত কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে হাঁটছে, তখন ইরানের জোটে তাদের অংশগ্রহণের প্রশ্নই আসে না।
 
পাকিস্তান নিজেও এই দ্বন্দ্বে বিপজ্জনক অবস্থানে আছে। ১৯৮৭ সাল থেকে সৌদি আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে ইসলামাবাদ বিভিন্ন সময়ে ইরান প্রতিকূল অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের হাজার হাজার সৈন্য সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় মোতায়েন ছিল। 

বর্তমান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, সৌদির বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কঠিন সমীকরণে দাঁড়িয়ে ইরানের পক্ষে মধ্যস্থতা করার এ স্ট্র্যাটেজিক হেজিংয়ের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে, যা রিয়াদ-তেহরান সম্পর্কের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভরশীল।

এ ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতার সবচেয়ে বড় সামরিক ঝুঁকি লুকিয়ে আছে তেল আবিবের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায়। ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে নিচ্ছে না এবং এককভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সামরিক হামলার ঘোষণা দিয়েছে। আমেরিকার বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ছাড়া তেহরানের মাটির গভীরে থাকা পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা কঠিন হলেও, তারা সাইবার হামলা বা ড্রোন আক্রমণ ও গুপ্ত হত্যা বাড়িয়ে দেবে। 

এর আগের সংঘাতের সময় তেহরান জানিয়েছিল, তাদের ওপর হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি পরিচালনাকারী উপসাগরীয় দেশগুলোও রেহাই পাবে না। কাতার, বাহরাইন বা আমিরাত ইরানের নিখুঁত ড্রোন ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতাকে ভয় পায়। ফলে একদিকে ইরানের কাউন্টার-অ্যাটাকের ভয়, অন্যদিকে ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এই দুইয়ের মাঝে পড়ে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এখন প্রকাশ্য বিরোধের চেয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের এই আলোচনাকে গোপনে স্বাগত জানাচ্ছে। তবুও এ ঘটনাপ্রবাহকে গৌণ ভাবা ঠিক হবে না। বৈশ্বিক ক্ষমতার বণ্টন দ্রুত বদলাচ্ছে। 

এসআইপিআরআই-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০০০ সালের ৩৬ শতাংশ থেকে নেমে এখন ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; বিপরীতে চীনের অংশ ৫ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশ হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্রিকস-এ ইরান, সৌদি, মিশর ও আমিরাতের যোগদানের পর এই জোটের অর্থনৈতিক আকার বৈশ্বিক জিডিপির ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জি-৭ কে ছাড়িয়ে গেছে। এসসিও-তে পাকিস্তান ও ইরানের যৌথ উপস্থিতি এবং বিআরআইয়ের সম্পৃক্ততা মিলিয়ে পশ্চিমা বিকল্প একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো ধীরে ধীরে সংখ্যার ভিত পাচ্ছে। পেজেশকিয়ানের প্রস্তাব সেই কাঠামোর মধ্যেই একটি নতুন স্থাপত্য খোঁজার চেষ্টা। 

অন্যদিকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটল এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অনুশীলনের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে, যা পাকিস্তান এ মুহূর্তে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে। এখন এ পুরো সমীকরণটি দিল্লির চশমা দিয়ে দেখলে এক নতুন কৌশলগত অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। 

ভারত মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর জন্য পাকিস্তানকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি বিকল্প পথ হিসেবে ইরানের চাবাহার বন্দরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যদি ইরানের প্রধান কৌশলগত অংশীদার এবং মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠে, তবে চাবাহার প্রকল্পে ভারতের সেই একচ্ছত্র প্রভাব ও কৌশলগত উদ্দেশ্য বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ভারতের তৈরি করা বাইপাস রুটের মূল অংশীদারই যখন পাকিস্তানের হাত ধরে বৈশ্বিক সমঝোতায় ফিরছে, তখন তা দিল্লির কানেক্টিভিটি রাজনীতির জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা।

ভারতের মতো বাংলাদেশও এই সমীকরণের বাইরে নয়, তবে তার অবস্থান ভিন্ন এবং সম্ভাবনাও আলাদা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি তিনটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নোঙর করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য (প্রধানত সৌদি ও আমিরাত) থেকে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ যায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। আবার অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগ দেশের উন্নয়নের একটি প্রধান অক্ষ। এ ত্রিভুজ বাস্তবতায় ইরানের নেতৃত্বে কোনো মার্কিনবিরোধী জোটে সরাসরি যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। 

বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতির মূল বিষয় হলো দেশের স্বার্থের প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা করে কোনো একটি মেরুতে ভেসে না যাওয়া। তবে পাকিস্তানের এই উত্থান থেকে বাংলাদেশের একটি সুনির্দিষ্ট পাঠ নেওয়ার আছে। পাকিস্তানের লিভারেজ মূলত সামরিক ও ভূকৌশলগত, আর বাংলাদেশের শক্তি অর্থনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক। 

চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান দেখিয়েছে, একটি মধ্যম শক্তির দেশ যদি সঠিক সময়ে সঠিক স্ট্র্যাটেজিক হেজিং করতে পারে, তবে নিজের ওজনের চেয়েও বড় লিভারেজ আদায় সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ মেরিটাইম নোড হিসেবে বাংলাদেশকেও টোকিও, দিল্লি, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের ভারসাম্য রক্ষার খেলায় প্রাকৃতিক সুবিধা দেয়। কিন্তু ভৌগোলিক সুবিধা এককভাবে কূটনৈতিক লিভারেজে রূপান্তরিত হয় না; সেজন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, ধারাবাহিক কৌশল এবং সঠিক মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। 

পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদ সফর শেষ পর্যন্ত দুটি ভিন্ন ধারার সংঘর্ষবিন্দু হিসেবে টানতে হবে। একদিকে আদর্শিক মুসলিম ঐক্যের পুরোনো ধারণা, যার ব্যর্থতা বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই স্পষ্ট। ওআইসি বা ডি-৮-এর অভিজ্ঞতা বলছে, এই সংগঠনগুলোর পরাশক্তিনির্ভর কাঠামো বদলায়নি। 

অন্যদিকে এ সফর প্রমাণ করে যে বহুমেরু বিশ্বে মধ্যম শক্তির দেশগুলো পরাশক্তিদের দাবার ঘুঁটি হয়ে থাকতে বাধ্য নয়। ওয়াশিংটন, তেহরান এবং ইসলামাবাদ অক্ষের এই নতুন বোঝাপড়া দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এমন একটি নজির রেখে যাচ্ছে, যার গভীর প্রভাব হয়তো আগামী বছরগুলোতে এই অঞ্চলের প্রতিটি সমীকরণে অনুভূত হতে থাকবে।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close