উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং তারল্য সংকটে নতুন ব্যবসা শুরু করার সাহস হারিয়েছেন অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে স্টার্টআপ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াই দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নের সামগ্রিক চিত্রকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। গত কয়েক বছরে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির গতি থমকে গেছে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির ধারাই এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগ নিয়ে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের এগিয়ে আসার হার তলানিতে ঠেকেছে। অথচ এই সময়ে যারা আগে থেকেই দেশের বড় বড় শিল্প-কারখানা ও ব্যবসার মালিক ছিলেন, তারা আরও বড় হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন কেউ ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে সাহস পাচ্ছেন না। ব্যাংকগুলোও নতুন বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের চেয়ে পুরোনো ও বড় করপোরেট গ্রুপগুলোকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে নতুন আইডিয়া বা উদ্যোগ থাকলেও পুঁজির অভাবে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে।
রোববার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশে গত ১২ থেকে ১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় আয় বৈষম্য বেড়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে নতুন উদ্যোক্তা খুবই কম সৃষ্টি হয়েছে। যারা আগে থেকেই শিল্প-কারখানার মালিক ছিলেন, তারাই মূলত আরও বড় হয়েছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল শিল্পে গ্যাসের অপ্রতুলতা।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে এসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ জন্য নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা, অর্থায়ন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিসিকের মাধ্যমে পাবনা, সিলেট ও সৈয়দপুরে নতুন শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যেসব শিল্প পার্কে প্লট বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে, সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করে নতুন শিল্প পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে কম জ্বালানি ব্যবহারকারী শিল্পে বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। এসএমই খাতের বিকাশে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে যে হারে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে সেই হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সম্পদের প্রবাহ নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। আয় বৈষম্য বৃদ্ধির এটি একটি বড় কারণ।
জাতিসংঘ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ৬০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান দরকার। প্রতি ১০টি কাজের মধ্যে ৭টি হবে এসএমই খাতে। এ ছাড়া অর্থায়ন এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। স্বল্পোন্নত দেশের শতকরা ৪১ ভাগ, মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ৩০ ভাগ এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ১৫ ভাগ উদ্যোক্তা ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। বিশ্বের ব্যবসার শতকরা ৯০ ভাগ, কর্মসংস্থানের ৬০-৭০ ভাগ এবং জিডিপিতে ৫০ ভাগ অবদান এমএসএমই খাতের।
বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষম দরিদ্র, নারী, যুবক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উন্নয়নের মেরুদণ্ড হিসেবে ভূমিকা রাখছে এসএমই খাত। তাই এসএমই খাতের উন্নয়নে সহায়ক নীতি, সহজ অর্থায়ন, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে সহায়তা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। পাশাপাশি শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণ, প্রযুক্তি-সহায়তা ও ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত করারও সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন সারা দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে, উদ্যোক্তাদের ব্যবসাকে প্রযুক্তি ও আইসিটি-বান্ধব করে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিক্রয় ও বাজারজাতকরণ, প্রচার-প্রসারে কাজ করছে, উদ্যোক্তাদের নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে, বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করছে। তবে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় এসএমই ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের সদয় মনোযোগ ও সহায়তা দরকার।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রায় ২২ লাখাধিক উদ্যোক্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেবা প্রদান করেছে, যাদের মধ্যে আড়াই লাখাধিক সরাসরি সুবিধাভোগী উদ্যোক্তা এবং ৬০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা।
শিল্পসচিব আব্দুন নাসের বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। এই খাতের উন্নয়নে এমএসএমই নীতিমালা ২০২৬ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
উইম্যান অন্ট্রাপ্রেনিউয়র্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব)-এর সভাপতি নাসরীন ফাতেমা আউয়াল বলেন, দেশের প্রায় এক কোটি পুরুষ উদ্যোক্তার বিপরীতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র প্রায় সাত লাখ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বাড়ে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পায়, শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। তাই নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন মানেই জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে আরও একধাপ অগ্রগতি।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই)। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে। এই খাতে প্রায় ৩ কোটিরও বেশি জনবল কর্মরত।
কেকে/এলএ