ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরের ইসলামপুর খাদ্য গুদামে চলছে লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি। দেখার যেন কেউ নেই। অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন ‘সেই’ ওসিএলএসডি দীপক সরকার। লাগাম টানতে ব্যর্থ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। সুশীল ভাব দেখালেও খাদ্য অধিদপ্তরে তিনি ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ’ হিসেবে পরিচিত। কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘বেনামী অভিযোগ’ করে বিষিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও দীপক বেশ পারদর্শী। ১২ বছর চাকরির ৫ বছর সাড়ে ৩ মাস ওসিএলএসডির দায়িত্ব পালন করে হাতিয়ে নিয়েছেন ৭ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করেছেন মোটা অঙ্ক। প্রযুক্তির সহযোগিতায় সঠিক তদন্ত হলেই অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ইসলামপুরে প্রায়ই উদ্ধার হয় সরকারি চাল। গরিবের চাল পাচার ও গুদামে নিয়ে পুনরায় ক্রয় দেখিয়ে অ্যাডজাস্ট করার জন্য মজুত রাখা হয়।
সূত্র জানায়, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্রয় করা ৩৬৯ টন ধান গুদামে মজুত না করে দুর্নীতিবাজ দীপক ক্রসিংয়ের জন্য সরাসরি পছন্দের রাইস মিলে পাঠিয়েছেন। পরে ক্রসিং আদেশ নিয়ে স্টক অ্যাডজাস্ট করবেন। ময়মনসিংহ ও মধুপুর স্টিল সাইলো ছাড়া যে কোনো এলএসডিতে চাল প্রেরণের ক্ষেত্রে করেন ভেল্কিবাজি। চাল না পাঠিয়ে ইনভয়েসের সঙ্গে টাকা পাঠান। আগের ২ গুদামে দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। তার দাপটে অতিষ্ঠ ছিলেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ স্টাফরা। ৫ বছর ৩ মাস ২১ দিন ৩ গুদামের দায়িত্বে থেকে দীপক ৪৫ হাজার টনের বেশি বোরো-আমন ধান ও চাল সংগ্রহ করেন। মিল মালিক ও কৃষকের নামে ১৮০ কোটি টাকার বেশি বিল প্রদান করে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্ক। এর আগে সরিষাবাড়ীতে ১ বছর ৭ মাস ২৩ দিন ও ফুলবাড়ীয়ায় ২ বছর ১৫ দিন দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে দীপক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে রোববার (২৮ জুন) পর্যন্ত ইসলামপুর গুদামে ১ হাজার ৬৮০ টন ধানের বিপরীতে ৩৬৯ টন এবং ৬ হাজার ৬৬১ টন চালের বিপরীতে ২ হাজার ৭৭১ টন ৯৪০ কেজি চাল ক্রয় করা হয়। অতিরিক্ত বরাদ্দসহ সংগ্রহ করা হবে ৮ হাজার টন চাল। সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩৫৮ টন ধারণক্ষমতার গুদামে গতকাল (২৮ জুন) পর্যন্ত ক্রয় করা ১ হাজার ৪১২ টন ২৫০ কেজি বোরো ও ৪৩১ টন ৩৭৯ কেজি আমন চাল মজুত ছিল। নতুন সংগ্রহ করা চালের মধ্যে ১ হাজার ৪২০ টনের বেশি ময়মনসিংহ ও মধুপুর স্টিল সাইলোতে প্রেরণ করা হয়। অন্যদিকে চাল রিসিভ নিয়ে ময়মনসিংহ সিএসডি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগের দ্বন্দ্বের কারণে এবার সেখানে মুভমেন্ট দেওয়া হয়নি। এদিকে ইসলামপুর গুদামে ক্রয় করা ৭০০ টন চাল নিম্নমানের। কয়েকটি খামালে ২০০ টন চাল লুকানো আছে। বাকি ৫০০ টন এরই মধ্যে মুভমেন্ট দেওয়া হয়েছে। টাকার বিনিময়ে চালগুলো রিসিভ করানো হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, দুর্নীতিবাজ দীপক সরকার মিলারদের কাছ থেকে প্রতি টন চালের জন্য ১ হাজার টাকা ঘুষ নিচ্ছেন। সংগ্রহ কমিটি ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছাড়া ঊর্ধ্বতন ২ কর্মকর্তার জন্য ৩০০ টাকা, বাকি ৭০০ টাকা দীপকের। এভাবেই তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেবেন। দীপক ১ বছর ৭ মাস ১৩ দিন যাবৎ ইসলামপুর গুদামে কর্মরত আছেন। এ সময়ে ২০ হাজার টন বোরো-আমন ধান ও চাল সংগ্রহ করেন। হাতিয়ে নেন ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। একই সময়ে ১৪ হাজার টন চাল ডেলিভারি ও অ্যাডজাস্ট করে ঘুষ নিয়েছেন দেড় কোটি টাকা। বোরো সংগ্রহের পর ইসলামপুরে দীপকের অবৈধ আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ কোটি টাকায়। জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া গুদামের দায়িত্বে থেকে অবৈধভাবে ৪ কোটি টাকা আয় করেন। সব মিলিয়ে ‘চতুর’ দীপকের অবৈধ আয় ৭ কোটি টাকার বেশি। সূত্র মতে, শ্বশুরবাড়ি শেরপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নামে-বেনামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। গুদামে কোয়ার্টার থাকলেও ৪৮ কিলোমিটার দূরের শেরপুর পৌর শহরে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।
জানা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের ৩ মাসের মাথায় কাছের বন্ধুর মাধ্যমে তৎকালীন ত্রাণ সচিবকে ২০ লাখ টাকা ‘ভোগ’ দিয়ে দীপক সরকার ১৫-১১-২০২৪ তারিখে ইসলামপুর খাদ্য গুদামের দায়িত্ব নেন। চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ওপর। এর আগে দীর্ঘ ২ বছর প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েও ৪ জেলার কোনো গুদামের দায়িত্ব পাননি বিতর্কিত ‘সেই’ দীপক। এ সময়ে চেষ্টা চালান ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ফুলপুর, গৌরীপুর ও শ্যামগঞ্জ গুদামের ওসিএলএসডি হওয়ার জন্য। দায়িত্ব না পাওয়ায় তৎকালীন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ও ‘বেনামী অভিযোগ’ করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ’ হয়ে তিনি কলকাঠি নাড়েন। এ সব কারণেই তখন তাকে কোনো গুদামের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, দীপক সরকার ১১-০৫-২০১৪ খাদ্য পরিদর্শক পদে যোগদান করেন। ২৯-০৪-২০১৫ পর্যন্ত চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ০৫-০৫-২০১৫ থেকে ১৪-০৫-২০১৭ পর্যন্ত শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ১৫-০৫-২০১৭ থেকে ০৭-০১-২০১৯ পর্যন্ত জামালপুরের সরিষাবাড়ী খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি, ০৮-০১-২০১৯ থেকে ১৩-১০-২০২০ পর্যন্ত জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ১৫-১০-২০২০ থেকে ৩০-১০-২০২২ পর্যন্ত ফুলবাড়ীয়া খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি এবং ৩১-১০-২০২২ থেকে ১৩-১১-২০২৪ পর্যন্ত বকশীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সূত্র মতে, দীপক ইসলামপুর খাদ্য গুদামকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। ‘ধুরন্ধর’ এ ওসিএলএসডি অধিকাংশ চাল মিল থেকে সরাসরি মুভমেন্ট দিচ্ছেন। অন্যদিকে হিস্যা ও মুভমেন্ট নিয়ে ২ রাইস মিল মালিকের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চলছে। চোরাই খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গেও হিস্যা নিয়ে প্রায়ই দীপকের দ্বন্দ্ব বাধে।
জানা যায়, ইসলামপুর খাদ্য গুদাম থেকে ২৩ হাজার ৪৭৭টি খাদ্যবান্ধব কার্ডে বছরে ৬ মাস ৩০ কেজি করে ৭০৪ টন ৩১০ কেজি, টিসিবির ২২ হাজার ৬০০টি কার্ডে ৫ কেজি করে প্রতি মাসে ১১৩ টন, ভিডব্লিউবির ৩ হাজার ৫২৩টি কার্ডে ৩০ কেজি করে ১০৫ টন ৬৯০ কেজি এবং ভিজিএফের ৫০ হাজার ৬৯৮টি কার্ডে বছরে ২ ঈদে ১০ কেজি করে ৫০৬ টন ৯৮০ কেজি চাল ডেলিভারি দেওয়া হয়। বিশেষ কারণে ভিজিএফের পরিমাণ বাড়ে। এছাড়া কাবিখার বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ইসলামপুরে গত দেড় বছরে ১৩১ টন ৭৮৮ কেজি চাল ও ১৩১ টন ৭৮৮ কেজি গম ডেলিভারি দেওয়া হয়। এছাড়া কাবিখা (নির্বাচনী) ১১১ টন চাল ও ১১১ টন গম বরাদ্দের বিপরীতে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রায়ই ইসলামপুরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি চাল জব্দ ও উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত দেড় বছরে বিভিন্ন এলাকায় পাচারের সময় ও মজুত অবস্থায় বিপুল সরকারি চাল উদ্ধার করে। এ সব ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও ওসিএলএসডি দীপকসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা পার পেয়ে যান। ঝুলে থাকে মামলা। কিছুদিন পর পুরোনো কায়দায় আবারও শুরু হয় সরকারি চাল পাচার ও মজুত। সূত্র মতে, গত বছরের ১ জুন গাঁওকুড়ার একটি রাইস মিল থেকে ১০ টন ৩০০ কেজি এবং ৩০ মে সদর ইউনিয়নের কাঁচিহারা থেকে ১৮ টন সরকারি চাল উদ্ধার করা হয়। খাদ্যবান্ধব ও ভিজিএফের এ সব চাল অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছিল। অন্যদিকে দীপকের সময় সরিষাবাড়ী ও ফুলবাড়ীয়ায় সরকারি চাল ধরা পড়ে নানা অঘটন ঘটে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কেকে/ এমএস