আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। ইতোমধ্যে দেশের ৮টি সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। একই সঙ্গে গতি বাড়িয়েছে জনসংযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে। বিশেষ করে রাজধানীর দুই সিটিতে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলটির মেয়র প্রার্থীরা। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ও মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ, মতবিনিময় ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তৎপর রয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমও। দলীয় সূত্রমতে, নগরবাসীর সমস্যাগুলো জানা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতেই ঢাকা দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
এর আগে গত ২২ জুন রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আটটি সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা অংশ নেন। তবে এসব প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করবে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিশে শুরা।
প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া অন্য প্রার্থীরা হলেন—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে তোকাত গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর শাখার আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। এসব পদে বেশ কয়েকজন প্রার্থী আলোচনায় আছেন। তাঁদের বিষয়ে জামায়াত আরও পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মজলিশে শুরা। সবকিছু ঠিক থাকলে শুরার পরবর্তী বৈঠকেই প্রার্থীদের নাম অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে অন্যান্য রাজনৈতিক দল যখন প্রার্থী বাছাই ও কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত, তখন জামায়াত সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে নামিয়ে আগাম নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে রাজধানীর দুই সিটিতে নিয়মিত জনসংযোগ ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরছেন দলটির প্রার্থীরা।
আধুনিক নগরী গড়ার অঙ্গীকার সেলিম উদ্দিনের : নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেলিম উদ্দিন। মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, ‘নগর উন্নয়নে তারুণ্যের ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার, বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন, গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ, ‘মানবতার বক্স’ কার্যক্রম, অসহায় মানুষের জন্য ‘ইচ্ছে পূরণ’ কর্মসূচি ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র উদ্বোধনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইতোমধ্যে নগরবাসীর সামনে তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। সেখানে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও প্রশাসন, শতভাগ আমানতদারি এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
সেলিম উদ্দিন জানান, তাঁর প্রাথমিক পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণের মাধ্যমে ঢাকাকে বিশ্বমানের শহরে উন্নীত করা, প্রতিটি পরিবারের জন্য নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা এবং সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে তিনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত মশকনিধন ক্যাশ প্রোগ্রাম চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধান সড়ক থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে ফুটপাত পথচারীবান্ধব করা, যানজট নিরসনে তাৎক্ষণিক ট্রাফিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিটি করপোরেশনের সেবাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে ডিজিটাল নাগরিক অভিযোগ ও জবাবদিহি সেল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সেলিম উদ্দিন বলেন, রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা হবে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ঢাকার প্রবেশমুখে মাল্টিলেভেল পার্কিং টার্মিনাল নির্মাণ এবং হকারমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত করা হবে, যাতে মানুষ স্বল্প দূরত্বে সহজে হেঁটে চলাচল করতে পারে।
তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তরের প্রতিটি জোনে আধুনিক আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং হাব গড়ে তোলা হবে। সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের পাশাপাশি কর্মমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হবে।
নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো ঢাকা উত্তরকে সিসিটিভি ক্যামেরা নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, প্রতিটি রাস্তায় আধুনিক স্ট্রিট লাইট স্থাপন, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং মাদক, ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের জন্য বিআরটিসির সহযোগিতায় বিশেষ স্টুডেন্ট বাস সার্ভিস চালু, গণপরিবহনে হাফ পাস নিশ্চিত করা এবং ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও ডেডিকেটেড পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে মৃতপ্রায় খাল ও জলাশয় উদ্ধার করে আন্তঃসংযোগ স্থাপন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের রোডম্যাপ তুলে ধরেন জামায়াতের এ মেয়র প্রার্থী।
তিনি বলেন, শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে বিদ্যমান খেলার মাঠ দখলমুক্ত করা হবে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে পার্ক ও সবুজ চত্বরের জন্য জায়গা সংরক্ষণ এবং বহুতল ভবনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত জায়গা রাখার বিধান কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সিটি গড়ার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত ‘নগর অ্যাপ’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান সেলিম উদ্দিন। এর মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ সিটি করপোরেশনের সব ধরনের সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও ডিজিটাল করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস ও পার্কে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমাতে উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনা পোড়ানো নিষিদ্ধ, নির্মাণাধীন ভবনে সেফটি নেট ও পানি ছিটানো বাধ্যতামূলক, মেকানিক্যাল সুইপিং গাড়ির মাধ্যমে রাস্তা পরিষ্কার এবং হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সাইলেন্ট জোন কার্যকর করার কথাও বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে ‘মেয়র্স স্কিল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা তুলে ধরে সেলিম উদ্দিন বলেন, সেখানে কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা অ্যানালিটিক্স ও আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
কেকে/এলএ