দেশজুড়ে হামের প্রকোপের মধ্যেই ভয় ধরাচ্ছে ডেঙ্গু। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার চলতি বছর ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখল দেশ। গতকাল সকাল ৮টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় ৫ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছর এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৮। এর মধ্যে চলতি জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৫ জনের মধ্যে ২ জন চট্টগ্রাম বিভাগে। ১ জন করে মারা গেছেন ময়মনসিংহ বিভাগে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। তাদের মধ্যে এক কিশোরীসহ ৩ জন নারী। অপর দুজন পুরুষ।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১২৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯২৪। তাদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০০ জনসহ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫ হাজার ৪৫৫ জন। চলতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭২৭।
বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ জন রয়েছেন বরিশালে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৭, ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৬, খুলনায় ১৪, রাজশাহীতে ৮ এবং ময়মনসিংহে ও ঢাকা মহানগরের বাইরে ২ জন করে রয়েছেন।
সাধারণত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে। বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অস্বাভাবিক আবহাওয়া, দীর্ঘ উষ্ণ সময় এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং তা ভয়াবহ হতে পারে। আগামী এক মাসের মধ্যে এডিসের বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। এ সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কমিউনিটি মোবিলাইজেশন জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এখন ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
চলতি বছরে অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীই রাজধানীর বাইরের বাসিন্দা। গত বছর দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এ সময় রোগটিতে মারা যান ৪১৩ জন।
গত বছরের নভেম্বরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি জরিপে দেখা যায়, বরগুনাসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বড় পাত্রে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। পানির সংকট এ বংশবিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর আইইডিসিআরের কীটতাত্ত্বিক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীর পৌরসভা এলাকা।
এদিকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় গত ২ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ বেড ফাঁকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্টে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে। শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হবে।
এবার প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রাক্-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনে কাজ করবে বলে জানা গেছে।
সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বহুতল ও নির্মাণাধীন ভবনে এডিস নিয়ন্ত্রণে রিহ্যাব এবং ফ্ল্যাট মালিক সমিতির মাধ্যমে বছরব্যাপী জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনা এবং এডিস মশার উচ্চ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বছরব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা জরুরি।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের দাবি, ‘মশা বেড়ে গিয়েছিল, আমাদের মনিটরিং টিম, আমাদের কর্মকর্তাদের দিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ মোটামুটি এখন ভালোভাবে কমাতে পেরেছি।’
এদিকে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্য রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে সরকার। সিটি করপোরেশন এলাকাসহ দেশের যেসব স্থানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বা শঙ্কা রয়েছে, সেখানে এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে। এদিকে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭ ওয়ার্ড: ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেকে/এলএ