কিশোরগঞ্জের নিকলী ও করিমগঞ্জ উপজেলায় পৃথক দুটি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক বাসের হেলপার ও এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ও সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় দুই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়দের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
নিহতরা হলেন—নিকলী সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়াহাটি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে হাদিস জিবু (২০)। তিনি নিকলী-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী বিসমিল্লাহ পরিবহনের বাসের হেলপার ছিলেন। অপরজন করিমগঞ্জ উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের বারবাট্রা গ্রামের ফজলুর রহমানের মেয়ে কুলসুম (১০)।
বাস কাউন্টার সূত্রে জানা যায়, নিকলী-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী বিসমিল্লাহ পরিবহনের একটি বাস সোমবার (২৯ জুন) রাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে বাসটি নিকলী বাসস্ট্যান্ডে ফিরে আসে। পরে সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-সংলগ্ন সড়কে বাসটি পার্কিং করার সময় হাদিস জিবু বাসের ছাদে ওঠেন। এ সময় অসাবধানতাবশত ওপর দিয়ে যাওয়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইনের সংস্পর্শে এলে তিনি গুরুতর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন।
সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাস শ্রমিকদের অভিযোগ, বাসস্ট্যান্ড ও পার্কিং এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
তবে এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিকলী জোনাল অফিসের এজিএম আবু বকর সিদ্দিক আকন্দ বলেন, “বাস পার্কিংয়ের সুবিধার্থে বাসের ছাদে উঠে বৈদ্যুতিক লাইনের তার উঁচু করার চেষ্টা করার সময় হাদিস বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। ঘটনাস্থলে কোনো ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার ছিল না। এ ঘটনায় পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো অবহেলা নেই।”
অন্যদিকে, একই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে করিমগঞ্জ উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের বারবাট্রা গ্রামে নিজ বাড়ির আঙিনায় খেলাধুলার সময় কুলসুম অসাবধানতাবশত একটি বিদ্যুতের তার স্পর্শ করলে গুরুতর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনরা জানান, কুলসুম পরিবারের অত্যন্ত আদরের সন্তান ছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালে স্বজনদের কান্নায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার বর্মন বলেন, “একই দিনে পৃথক দুটি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন অপসারণ, নিয়মিত তদারকি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ঝুলন্ত তার এবং বিদ্যুৎ, ডিশ ও ইন্টারনেট লাইনের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”
ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান এবং করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ রোজিন।
স্থানীয়দের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত সংস্কার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
কেকে/এলএ