বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার থানারোড এলাকার চিত্র বদলে যায়। চারদিকে সবুজ-হলুদের ছোঁয়া, উড়ছে অসংখ্য ব্রাজিলের পতাকা, দোকান-বাড়ি রঙিন ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে সাজানো। সন্ধ্যা নামতেই বড় পর্দার সামনে জড়ো হন হাজারো ফুটবলপ্রেমী। স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি তখন পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ব্রাজিল রাজ্য’ নামে।
এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের নেপথ্যের মানুষ দত্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাবুদ্দিন। পেশায় হলুদ ও মরিচ ভাঙানোর মেশিন পরিচালনা করলেও এলাকায় তিনি বেশি পরিচিত ‘ব্রাজিল পাগলা ভক্ত’ হিসেবে। তার বাবা মোহাম্মদ আলী বেপারি।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকেই ব্রাজিলের প্রেমে পড়েন শাহাবুদ্দিন। সেই ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। গত ৪০ বছর ধরে প্রতিটি বিশ্বকাপে নিজের অর্থায়নে ব্রাজিলকে ঘিরে নানা আয়োজন করে আসছেন তিনি।
শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি উৎসব। ব্রাজিলের খেলা মানেই আনন্দ। চাই সবাই একসঙ্গে বসে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করুক।’
তিনি জানান, ২০০২ সালের বিশ্বকাপে একটি সাদা-কালো টেলিভিশনে খেলা দেখানোর মাধ্যমে তার আয়োজন শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে বড় পর্দা, উন্নত সাউন্ড সিস্টেম এবং দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ম্যাচে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার দর্শক একসঙ্গে খেলা উপভোগ করেন।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিজের দোকান ও বাড়িকে ব্রাজিলের রঙে সাজিয়ে তোলেন তিনি। দোকানের দেয়ালজুড়ে ব্রাজিলের রঙ, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, খেলোয়াড়দের ছবি ও বড় বড় পতাকা। বাড়ির ছাদেও উড়ছে বিশাল ব্রাজিলের পতাকা। প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে ব্রাজিলের আদলে বিশেষ সাজসজ্জা।
শুধু সাজসজ্জাই নয়, দর্শকদের জন্য থাকে আপ্যায়নের ব্যবস্থাও। প্রতিটি ম্যাচে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। ফলে খেলা দেখতে আসা দর্শকদের কাছে এটি এখন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
২০০২ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি আজও আবেগ নিয়ে স্মরণ করেন শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সেবার ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর একটি গরু জবাই করে ব্রাজিল সমর্থকদের খাওয়াই। এবারও যদি ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতে, ইনশাআল্লাহ আবারও একইভাবে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করব।’
শাহাবুদ্দিনের এই আয়োজন ঘিরে শুধু ব্রাজিল সমর্থকেরাই নন, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরাও প্রতিদিন ভিড় করেন। দুই দলের সমর্থকদের হাসি-ঠাট্টা, তর্ক আর উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা মুখর থাকে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল হক বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সাহাবুদ্দিন কাকার ব্রাজিলপ্রেম দেখে বড় হয়েছি। তার আয়োজন দেখেই আমি ব্রাজিলের সমর্থক হয়েছি। এখানে খেলা দেখলে মনে হয় স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছি। জন্মের পর থেকে প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপের খেলাই এখানে দেখেছি।’
আর্জেন্টিনা সমর্থক মানিক মিয়া বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও খেলা দেখতে সাহাবুদ্দিন কাকার দোকানেই আসি। এখানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা একসঙ্গে খেলা দেখি, মজা করি, তর্ক করি। কিন্তু সবকিছুই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়।’
আরেক আর্জেন্টিনা সমর্থক পলাশ গৌড় বলেন, ‘আমি চায়ের দোকান চালাই। সাহাবুদ্দিন কাকার ব্রাজিলপ্রেম দেখে আমিও আমার দোকান আর্জেন্টিনার রঙে সাজিয়েছি। এখন বিশ্বকাপ এলেই ঈশ্বরগঞ্জ থানারোড যেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার উৎসব নগরীতে পরিণত হয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিশ্বকাপকে ঘিরে শাহাবুদ্দিনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন শুধু ফুটবলপ্রেমের প্রকাশ নয়, এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনমেলারও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতি বিশ্বকাপে দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো ফুটবলপ্রেমী এখানে ছুটে আসেন। এক সময়ের ছোট্ট উদ্যোগ আজ ঈশ্বরগঞ্জের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির একটি পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কেকে/ এমএস