দেশে হামের প্রকোপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, এর মধ্যেই নতুন করে ভয় ধরাচ্ছে ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত মে মাসের তুলনায় জুনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়েছে। মৃত্যুর সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা হাতেগোনা হলেও খোদ জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে জুলাই-আগস্টে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ সতর্কবার্তাকে আমলে না নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
প্রতিবছরই ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে একই ধরনের আশঙ্কার কথা শোনা যায়, আর প্রতিবারই দেখা যায় প্রস্তুতির ঘাটতি থেকে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাভাবিক নিয়মে তিন মাস অন্তর রাজধানীতে এডিস মশার ঘনত্ব নিরূপণে যে জরিপ হওয়ার কথা, অর্থ সংকটের অজুহাতে তা এবার হয়নি। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে জরিপ চালিয়ে অন্তত বিশটি ওয়ার্ডে উদ্বেগজনক মাত্রায় এডিসের লার্ভার সন্ধান পেয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মশা নিয়ন্ত্রণে যে ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ দরকার, তাতে বড় রকমের শৈথিল্য রয়ে গেছে। দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমেও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। একটি সংস্থা তুলনামূলক নিয়মিত কার্যক্রম চালালেও অন্যটি মাঠপর্যায়ে পিছিয়ে থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অথচ ডেঙ্গুর মতো একটি রোগ, যা এখন আর মৌসুমভিত্তিক থাকছে না বরং সারা বছরই কমবেশি সক্রিয় থাকছে, তা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন বা মৌসুমি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, শুধু ফগিং করে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংসের মতো লক্ষ্যভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর পদক্ষেপ। এ পরামর্শ নতুন নয়, তবু বছরের পর বছর তার বাস্তবায়নে যে গাফিলতি দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
এবার একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে রাজধানীর চেয়ে রাজধানীর বাইরে সংক্রমণ বেশি ছড়ানোর আশঙ্কা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বরিশাল বিভাগে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে, এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম ও খুলনা। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আমরা মনে করি, ডেঙ্গু ও হাম দুটি ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা এক জায়গায় : প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব। হামের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি ও কম সচেতন জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থতা থেকে গেছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও একইভাবে সচেতনতা কার্যক্রম ও বাস্তব মশা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় ফাঁক রয়ে গেছে। শুধু সিটি করপোরেশন কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একক প্রচেষ্টায় এ ফাঁক পূরণ সম্ভব নয়; প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় পানি জমে থাকার সুযোগ না দেওয়া, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় সংক্রমণ ঠেকানোর প্রথম ধাপ।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার কথাও বলা হয়েছে। এ আশ্বাস যেন কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নিয়মিত মনিটরিং এবং জবাবদিহি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রজননস্থলভিত্তিক লক্ষ্যযুক্ত অভিযান জোরদার করা, দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে সমন্বয় আনা এবং জেলা পর্যায়ের চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এ তিনটি ক্ষেত্রে অবহেলার আর কোনো সুযোগ নেই। জুলাই মাস সবে শুরু হয়েছে; এখনই সচেতন ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে আসন্ন মাসগুলোতে সম্ভাব্য বিপর্যয় অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব। অন্যথায় বিলম্বের মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন দিয়ে।
কেকে/ এমএস