মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের ভেতরে কুকুরের অবাধ বিচরণ, রোগীর শয্যার পাশে বিড়ালের বিষ্ঠা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাবার যথাযথভাবে সরবরাহ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও ফার্মেসির সামনে একাধিক কুকুর ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা আতঙ্কের মধ্যে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে আসা স্বজনরা বলছেন, কুকুরের কারণে হাসপাতালে প্রবেশ করতেই ভয় কাজ করছে।
অন্তর্বিভাগের বারান্দায় রোগীদের জন্য রাখা একটি শয্যার পাশে বিড়ালের বিষ্ঠা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া ডেলিভারি বিভাগের সিঁড়িতেও কুকুরের বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। এমন পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, বহির্বিভাগের পাশের ওয়াশরুমে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নেই। এমনকি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রীও অনুপস্থিত। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী শামিম ইসলাম বলেন, “আমার চার বছর বয়সী শিশুকে নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখাতে এসেছি। কিন্তু টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার আগে গেটের সামনে কয়েকটি কুকুর দেখে আমার ছেলে ভয়ে কান্না শুরু করে। আমারও ভয় কাজ করছে, কখন যে কুকুর কামড় দিয়ে বসে।”
বিলকিস বেগম বলেন, “হাসপাতাল একটি নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা। অথচ হাসপাতালের ফার্মেসি এবং দুইতলায়ও কয়েকটি কুকুরকে ঘুরতে দেখেছি। কুকুর কখন কী করে বসে, তা নিয়ে রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।”
ফুয়াদ আলম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, “হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের জন্য কয়েকটি বেড রয়েছে। একটি বেডে আমার আঙ্কেল ভর্তি আছেন। কিন্তু পাশের একটি শয্যায় বিড়ালের বিষ্ঠা (মল) পড়ে রয়েছে, যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।”
বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সাজু নামে আরেক রোগী বলেন, “বহির্বিভাগের পাশের টয়লেটে পানি নেই, এমনকি বদনাও নেই। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার কথা আর কী বলব! এসব কি দেখার কেউ নেই?”
রোগীদের খাবার নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, ডায়েট চার্ট অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শিশু ওয়ার্ডের কয়েকজন রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সকালের নাশতায় কলা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক রোগী তা পাননি। অনেকে বুধবার (১ জুলাই) দুপুরের আগে ভর্তি হলেও রাতে খাবার পাননি বলেও অভিযোগ করেন। পাশাপাশি নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগও ওঠে।
একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এর আগেও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ উঠেছিল। গত রবিবার (৩১ মে) দৈনিক খোলা কাগজ-এ ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহের অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১ জুন) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কর্তৃপক্ষ। নতুন করে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় হাসপাতালের তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। সরকারি হাসপাতালে এমন অব্যবস্থাপনার ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আকাশ নুনিয়া জানান, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কলার মানগত সমস্যার কারণে তা পরিবর্তন করে পরে সরবরাহ করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
কেকে/এলএ