কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার একটি সরকারি সড়কের পুরোনো ইট আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন তাঁতী দলের সভাপতির বিরুদ্ধে।
অভিযোগের পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকার একাধিক বাসিন্দা। তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সরকারি সম্পদ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত মো. মোস্তফা পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এবং ইউনিয়ন তাঁতী দলের সভাপতি বলে জানা গেছে।
অভিযোগে সুত্রে জানা যায়, উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা ও আইঠিয়া গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় সম্প্রতি একটি নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়। নতুন সড়ক নির্মাণের আগে সেখানে একটি ইটের সোলিং রাস্তা ছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য পুরোনো সড়কের ইটগুলো খুলে ফেলা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পুরোনো রাস্তা থেকে উঠানো প্রায় ১৫ হাজার সরকারি ইট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে এলাকার দীর্ঘদিনের চলাচল-অনুপযোগী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কারে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য সরকারি ইটগুলো আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, সরকারি সম্পদ জনস্বার্থে ব্যবহারের পরিবর্তে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে এলাকার মানুষ একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কারের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এ ঘটনায় সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারী পক্ষ উপজেলা প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো—সরকারি ইটগুলোর বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনস্বার্থে ইটগুলো নির্ধারিত ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কারে ব্যবহার নিশ্চিত করা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “পুরোনো ইটগুলো এলাকার একটি দীর্ঘদিনের ভাঙাচোরা রাস্তায় ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সবাই সেই সিদ্ধান্তের পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করুক এবং সরকারি সম্পদ জনস্বার্থেই ব্যবহার নিশ্চিত করুক।”
আরেক বাসিন্দা মো. রফিক মিয়া বলেন, “সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে কেউ সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করার সাহস পাবে না।”
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, “আমাদের গ্রামের একটি রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অনুপযোগী। বর্ষাকালে এই পথে চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। পুরোনো ইটগুলো সেখানে ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক এবং গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ গ্রহণ করুক।”
অভিযোগকারী পক্ষের এক প্রতিনিধি বলেন, “এটি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় নয়। আমরা চাই সরকারি সম্পদ যেন ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার না হয়। জনগণের সম্পদ জনগণের স্বার্থেই ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. মোস্তফা। তিনি বলেন, “আমি কোনো সরকারি ইট আত্মসাৎ বা বিক্রি করিনি। নতুন রাস্তার নির্মাণকাজের সময় পুরোনো ইট তোলার পর দেখা যায়, সেগুলো পুনরায় রাস্তা নির্মাণের উপযোগী ছিল না। বিষয়টি আমি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)-কে জানাই। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ইটগুলো ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযোগের পর ইউএনও কার্যালয়ে আমাকে ডাকা হয়েছিল। সেখানে পিআইও ও ঠিকাদার উভয়েই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।”
এ বিষয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। তদন্তের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি রূপসা এইচবিপি প্রকল্পের কাজ একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
কেকে/ এমএস