দীর্ঘ কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত। রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডাউংসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে তীব্র গোলাগুলি, ভারী অস্ত্রের ব্যবহার এবং বিমান হামলার ঘটনায় সীমান্তজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। সীমান্তজুড়ে টহল জোরদার, অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, সীমান্তবর্তী বাসিন্দা এবং বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (১ জুলাই) রাত ৯টার পর থেকে রাখাইন রাজ্যের মংডু, বুথিডাউংসহ বাংলাদেশ-সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে একাধিক দফায় ভারী গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার ঘটনা ঘটে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু, বাইশফাঁড়ি, চেরার মাঠসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় স্পষ্টভাবে শোনা যায়। এতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক (জিএএন) দাবি করেছে, বুথিডাউং এলাকায় বিমান হামলায় দুই শিশুসহ তিনজন মুসলিম আহত হয়েছেন। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বস্ত সীমান্ত সূত্রের দাবি, মংডু জেলা শহর, কাইন্ডাপাড়া, ফাতংজা, কাওয়ার বিল ও শিকদারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনী ধারাবাহিক বিমান হামলা ও ভারী গোলাবর্ষণ চালাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম এবং বিমান প্রতিরোধে সক্ষম অস্ত্রের অভাবে আরাকান আর্মি কৌশলগত চাপে পড়েছে বলেও সীমান্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে আরাকান আর্মির একজন সিনিয়র কমান্ডিং নেতা সদস্যদের পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে একাধিক সীমান্ত সূত্র দাবি করেছে। তবে এ তথ্যেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তে অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বিজিবি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল থেকেই সীমান্তে বাড়তি সদস্য মোতায়েন, টহল বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু হয়েছে।
এদিকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেয় থেয় মার্মা (২০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সোপর্দ করেছে নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন (১১ বিজিবি)। সীমান্ত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আটক ব্যক্তি আরাকান আর্মির ছয় মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বুধবার রাতের বিস্ফোরণের শব্দ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু এলাকার বাসিন্দা মো. ছৈয়দুল বশর বলেন, হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। পরপর কয়েকটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আবছার বলেন, বিস্ফোরণগুলো মিয়ানমারের ভেতরে হয়েছে। তবে আমরা আতঙ্কিত নই। সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে আমাদের মধ্যে আস্থা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকিও বাড়ছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনে সংঘাত নতুন মাত্রা পেলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্তে পড়তে পারে। বিশেষ করে অনুপ্রবেশ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সীমান্তবর্তী জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি আপাতত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক থাকলেও ওপারের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন সীমান্তবাসী ও প্রশাসনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম, পিবিজিএম, পিএসসি বলেন, গত বুধবার (১ জুলাই) রাতের দিকে মিয়ানমারের মংডু এলাকার সীমান্তের ওপারে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জেনেছি। ওই গোলাগুলির বিকট শব্দ নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। পরিস্থিতির ওপর আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছি এবং বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের (১১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল কবির পিএসসি, ইঞ্জিনিয়ার্স বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরের সংঘর্ষ তাদের নিজস্ব বিষয়। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপদ রাখা এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে টহল ও সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। একজন উপজাতীয় ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেকে/ এমএস