ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। প্রায় দুই কোটি শোকাহত মানুষ এতে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, শোকসভা ও শোকমিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। গত মার্চে খামেনির দাফন হওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রথম দিন নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। ওই সময় তিনি তেহরানে তার আবাসিক ভবনে ছিলেন।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ:
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ রাখা হয়েছে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় (দেশটির সবচেয়ে বড় জুমার নামাজ আদায়ের স্থান)। বিদেশি অতিথি ও বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তার মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। শুক্রবার ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার সঙ্গে নিহত হওয়া অন্য ব্যক্তিদের মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানকার প্রধান নামাজের কক্ষে মরদেহগুলো রাখা হয়। এরপর শুরু হয় শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা।
খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে আছেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাবার শেষ বিদায়ে থাকছেন না মোজতবা খামেনি:
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় তার ছেলে, দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি উপস্থিত থাকছেন না। বৃহস্পতিবার ভারতে নিযুক্ত তার প্রতিনিধি এমন তথ্য দিয়েছেন। ওই প্রতিনিধি বলেছেন, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে হত্যা করা হবে বলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকতায় থাকছেন প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধিদল:
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, খামেনির দাফনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তি, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্তত ৮ জন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন। এছাড়া আরও অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী অথবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাবে। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল দাফনপ্রক্রিয়ার কর্মসূচিতে যোগ দিতে ইরানে গেছেন। তবে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানো ইউরোপের দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
সাত দিনব্যাপী জানাজার আনুষ্ঠানিকতা:
শুক্রবার তেহরানে শুরু হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা। ইরান ও ইরাকে নানা ধর্মীয় আয়োজনে সাত দিন এই আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এতে বিভিন্ন দেশের নেতা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পণ্ডিতেরা অংশ নিয়ে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
৪-৫ জুলাই: ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বসাধারণের জন্য জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সাধারণ মানুষের বিদায় জানানোর সুবিধার্থে খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের কফিন তেহরানের প্রধান ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে।
৬-৭ জুলাই: ৬ ও ৭ জুলাই খামেনির মরদেহ নিয়ে একটি শোকমিছিল তেহরানের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করবে। পরে তা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে ইরানের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। হাজারো আলেম ও শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। আলী খামেনিও জীবনের একটি পর্যায়ে এখানেই অধ্যয়ন করেছিলেন।
৮ জুলাই: ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে। এরপর নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। নাজাফে অবস্থিত ইমাম আলীর মাজার শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতিবছর সেখানে লাখো শিয়া ধর্মানুরাগী সমবেত হন। অন্যদিকে কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার সৎভাই আব্বাসের মাজারও শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ও আব্বাস নিহত হন।
৯ জুলাই: সবশেষে ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদ ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শহর হিসেবে বিবেচিত। ইমাম রেজা শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম। এই শহরের সঙ্গে খামেনির ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর। ১৯৩৯ সালে মাশহাদেই তার জন্ম। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি এই শহরে কাটিয়েছেন। এখানকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোমে যান।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পিছিয়ে দেওয়া হয় দাফনের সময়:
খামেনিকে প্রথমে মার্চ মাসে দাফন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়। শনি ও রোববার তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এ সময় খামেনির কফিন তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কফিনের পাশে তেহরানের অন্যতম বৃহৎ নামাজের স্থান গ্র্যান্ড মোসাল্লার প্রাঙ্গণে রাখা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে যেসব দেশ:
তুরস্ক: তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ খামেনির দাফনপ্রক্রিয়ার কর্মসূচিতে অংশ নেবেন বলে আঙ্কারা নিশ্চিত করেছে।
ভারত: ভারত সরকার জানিয়েছে, দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও একটি রাজ্যের গভর্নর খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা শুক্রবার ইরান সফর করছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসনাইন বর্তমানে ভারতের সরকারি পদে থাকা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ শিয়া ব্যক্তিত্ব। ভারতের প্রতিনিধিদলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং বিরোধী নেতা মেহবুবা মুফতিও রয়েছেন।
চীন: চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই তেহরানে অনুষ্ঠিত শোকানুষ্ঠানে যোগ দেবেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দেয়।
রাশিয়া: রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ শোকানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন বলে ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে। মেদভেদেভ রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী।
আফগানিস্তান: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি তেহরানে পৌঁছেছেন। অর্থনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদারও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকানুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে গেছে।
আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠান আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানগুলোর একটি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এর পরিসর ১৯৮৯ সালে ইরানের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শোকানুষ্ঠানকেও ছাড়িয়ে যাবে। খোমেনির শেষযাত্রায় প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
নিরাপত্তার কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত এ তথ্য জানিয়েছেন। সম্প্রতি মোজতবা খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমেরিকা দিবসের সমান্তরালে খামেনির দাফন প্রক্রিয়া:
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস বা আমেরিকা দিবসের আয়োজনের (৪ জুলাই) সমান্তরালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়াকে ঘিরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। খামেনির মৃত্যু এবং দাফনকে কেন্দ্র করে ইরান ও ইরাকে বিশাল শোক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের শ্রদ্ধা:
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের পার্লামেন্ট স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গতকাল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সেখানে তিনি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছান স্পিকার। শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে তেহরানে ইরানের ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির (পার্লামেন্ট) স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শ্রদ্ধা জানালেন এনসিপি-জামায়াত-খেলাফত মজলিসের প্রতিনিধিদল:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ আলী হুসাইনি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরান সফরে গেছেন এনসিপি, জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। গতকাল তারা সবাই একসঙ্গে খামেনির মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারে দেখানো হয়। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামেনির মরদেহের সামনে শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন।
কেকে/এলএ