পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ডাকসাইটে নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ নারীকে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চলছে। এখনো ফ্যাসিস্টের ‘সেই’ ভূত। চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ উপেক্ষা করে সাংঘর্ষিক প্রজ্ঞাপন জারি করে খাদ্য অধিদপ্তর। মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে এ ধরনের আদেশ জারি করায় প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় মাঠ প্রশাসনে তোলপাড় চলছে। সংগ্রহ মৌসুমে হঠকারী প্রজ্ঞাপনের কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন সাইলো ও গুদামের দায়িত্বে থাকা অধীক্ষক, ম্যানেজার, এসএমও এবং ওসিএলএসডিরা। জামালপুরের রাইস মিল মালিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আলোচিত এ নারী খাদ্য কর্মকর্তার কারণে এর আগে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তা নাস্তানাবুদ হয়েছেন। ময়মনসিংহের তৎকালীন আঞ্চলিক নারী খাদ্য নিয়ন্ত্রককে অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি বিসিএস খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তবে প্রভাবশালী মির্জা আজমের ভয়ের কারণে কর্মকর্তারা তখন চুপ থাকতে বাধ্য হন।
জানা যায়, বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ মৌসুমে সাইলো, সিএসডি ও বিভিন্ন শ্রেণির এলএসডিগুলোর কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, সংগ্রহ কার্যক্রম নিরবিচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন রাখতে খাদ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ জারি করে। আদেশে বলা হয়— পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাইলো অধীক্ষক, সিএসডি ম্যানেজার এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসিএলএসডি) বদলি ও পদায়ন বন্ধ থাকবে। তবে কোনো কারণে পদ শূন্যতা সৃষ্টি ও গুরুতর অসুস্থতা জনিত কারণে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে শূন্য পদে বদলি ও পদায়ন করতে পারবেন। এ বছরের ২৩ এপ্রিল ১৩.০০.০০০০.০০০.০২২.৯৯.০০০১.২৬.১৫ স্মারকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আবু নাসার উদ্দিন এ অফিস আদেশ জারি করেন। সূত্র মতে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট মুক্ত রাখতে সংগ্রহ মৌসুমে এ ধরনের অফিস আদেশ জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের ২৩ এপ্রিলের অফিস আদেশ উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গোপনে আগের তারিখ দিয়ে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে খাদ্য অধিদপ্তর। জামালপুর সদরের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুরকে সিংহজানী এলএসডি-১ এর এসএমও এবং এসএমও ইসরাত আহমেদ পাপেলকে নেত্রকোনার মদন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি করা হয়। এ নিয়ে সরব আলোচনা হচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠ প্রশাসনে। নুপুর ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর জামালপুর সদরে যোগদান করেন। এখনো তার ২ বছর মেয়াদ পূর্ণ হয়নি। শনিবার (৪ জুলাই) এ খবর লেখা পর্যন্ত সময়ে নুপুরের স্থলে কাউকে বদলি করা হয়নি। সূত্র মতে, যে কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপে খাদ্য অধিদপ্তর বদলির এ প্রজ্ঞাপন জারি করতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। গোপন করে রাখা হয়েছে অসম্পূর্ণ নথি। গত ১ জুলাই ১৩.০১.০০০০.০০০.০১৩.১৯.০০০৭.২৬.৩১২ স্মারকের প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সংস্থাপন শাখার উপ-পরিচালক অনির্বাণ ভদ্র।
জানা যায়, পতিত আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা সাবেক এমপি মির্জা আজম আলোচিত খাদ্য পরিদর্শক আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুরের পক্ষে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদনসহ ডিও লেটার পাঠান। বাজাস/বপামসসক/২০২১/২১৩৯ স্মারকে ১১-০৮-২০২১ তারিখ স্বাক্ষর করা ডিও লেটারে মির্জা আজম পারিবারিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে নুপুরকে মেলান্দহ খাদ্য গুদামে বদলির সুপারিশ করেন। অথচ নুপুরের বাড়ি থেকে এই গুদামের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। ক্ষমতাধর এমপির অযৌক্তিক কথা না শোনায় কয়েকদিনের মাথায় আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুনকে খাদ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক। একই সময় নাকানি-চুবানি খাওয়ানো হয় মহাপরিচালকসহ অন্যদের। সূত্র মতে, নুপুরের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আব্দুল ওয়াদুদ অদু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। মির্জা আজম তার অধীনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। নুপুর আওয়ামী লীগের প্রভাবে ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে দাপটের সঙ্গে চাকরি করেন। দুর্নীতি করে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, নুপুর তদবির করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯-০৬-২০১০ খাদ্য পরিদর্শকের চাকরি নেন। ০৬-০৭-২০১০ থেকে ০৬-১২-২০১৫ পর্যন্ত শেরপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। ০৭-১২-২০১৫ থেকে ১০-০৪-২০১৯ পর্যন্ত নকলা খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি ছিলেন। ২ বছরের স্থলে ৩ বছর ৪ মাস ৩ দিন কর্মরত থেকে খাদ্য বিভাগকে বিষিয়ে তোলেন। তার স্থলে পরপর ২ জনের বদলি হলেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে কাউকেই যোগদান করতে দেননি। ১১-০৪-২০১৯ থেকে ০৯-০৬-২০১৯ পর্যন্ত শ্রীবরদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ১০-০৬-২০১৯ থেকে ০৭-০৩-২০২২ পর্যন্ত ২ বছর ৮ মাস ২৭ দিন ঝিনাইগাতী খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি এবং ০৮-০৩-২০২২ থেকে ১৩-১২-২০২৩ পর্যন্ত নালিতাবাড়ী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ১৪-১২-২০২৩ থেকে ০৪-১২-২০২৪ পর্যন্ত ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন।
জানা যায়, আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুর ০৫-১২-২০২৪ থেকে জামালপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ দেড় বছরে তিনি খাদ্যবান্ধব, টিসিবি, ওএমএস, ভিডব্লিউবি, ভিজিএফ, কাবিখা ও কাবিখা (নির্বাচনী) ডিও ইস্যুতে বহু অনিয়ম করেন। বিতরণের ক্ষেত্রেও করা হয় অনিয়ম ও দুর্নীতি। অনেক ক্ষেত্রে বিতরণের দায়িত্ব পালন করেন আলোচিত ‘সেই’ নৈশ প্রহরী। অন্যদিকে দীর্ঘ ৬ বছর ১ মাস ২ গুদামে ওসিএলএসডির দায়িত্বে থেকে নুপুর বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। আওয়ামী লীগের প্রভাব বিস্তার করে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বাবা ও গুদামের ‘সেই’ নৈশ প্রহরীকে দিয়ে পেশাদার সাংবাদিকদের নামে দায়ের করান মিথ্যা মামলা। আদালতে মামলাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সূত্র মতে, ‘সেই’ নৈশ প্রহরীকে দিয়েই চালানো হয় অফিসের যাবতীয় কার্যক্রম। যেখানে বদলি, সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা কোটার ‘সেই’ নৈশ প্রহরীকে। বিষয়টি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’।
মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে সাংঘর্ষিক প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খানের সঙ্গে শনিবার (৪ জুলাই) যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কেকে/এলএ