জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া চট্টগ্রামের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্পগুলোর একটি ছিল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, যার বর্তমান নাম শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক।
নগরীর যানজট নিরসন, বিমানবন্দর ও বন্দরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উড়াল সড়ক উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি। এখনো সবকটি র্যাম্প বন্ধ থাকায় প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। কবে নাগাদ এটি শতভাগ চালু হবে, তারও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছে না প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
অন্যদিকে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে মনগড়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত যানবাহন উড়াল সড়কে উঠছে না। অথচ নিচের সড়কেও কমেনি যানজট।
এদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান এখনো প্রকল্পের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একের পর এক সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, র্যাম্প নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ব্যর্থতার পরও একই কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন অনেকেই। তার দক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রকল্প পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
প্রকল্প সূত্র জানায়, লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়াল সড়ক নির্মাণে বর্তমানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। শুরুতে যানবাহনের ওঠানামার জন্য ১৫টি র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ৯টিতে আনা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এসব র্যাম্প চালু করা যায়নি। কয়েকটির নির্মাণ শেষ হলেও যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে শুধু লালখান বাজার, মুরাদপুর ও পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে উড়াল সড়কে ওঠার সুযোগ রয়েছে। নগরীর অন্য এলাকার মানুষ এখনো এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
২০১৭ সালের আগস্টে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং ২০২০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আপত্তি এবং পরিকল্পনাগত জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার পিছিয়ে যায়। পরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আরও ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকায়।
এ প্রকল্পে সরকার সিডিএকে ৫২৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ২০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণের ওপর ২ শতাংশ সুদ হিসেবে আরও ১৩০ কোটি টাকা গুনতে হবে। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে ২০২৮ সাল থেকে সুদ-আসলে মোট ৬৫৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে সিডিএকে।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকল্পের সব কাজ শেষ হওয়ার আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উড়াল সড়কটির উদ্বোধন করেন। তবে তখন মূল অবকাঠামো ও র্যাম্পের কাজ শেষ না হওয়ায় যান চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি টোল আদায়ের মাধ্যমে ‘এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের উদ্বোধন করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের ইপিজেড, সল্টগোলা, বন্দরটিলা, আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, দেওয়ানহাট ও বারেক বিল্ডিং মোড়ে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট লেগেই থাকে। অথচ একই সড়কের ওপর নির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অধিকাংশ সময় হাতেগোনা কয়েকটি গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। যে উড়াল সড়ক যানজট কমানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্মিত হয়েছিল, সেটিই এখন প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে।
যাত্রীরা বলছেন, র্যাম্পগুলো চালু থাকলে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সরাসরি উড়াল সড়কে ওঠা যেত। এতে নিচের সড়কের যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে আসত। কিন্তু র্যাম্প বন্ধ থাকায় অধিকাংশ চালক বাধ্য হয়ে নিচের সড়কই ব্যবহার করছেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেন্সির সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে লালখান বাজার-পতেঙ্গা করিডরে প্রতিদিন ৮১ হাজার ২৭১টি যানবাহন চলাচল করবে। এর অন্তত অর্ধেক, অর্থাৎ ৪০ হাজারের বেশি যানবাহন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার যানবাহন এ উড়াল সড়ক ব্যবহার করছে। প্রতিদিন টোল আদায় হচ্ছে গড়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা। ফলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল ও ট্রেইলার ছাড়া ১০ ধরনের যানবাহন উড়াল সড়ক ব্যবহার করতে পারে। প্রাইভেট কারে ৮০ টাকা, মাইক্রোবাসে ১০০ টাকা, পিকআপে ১৫০ টাকা, মিনিবাসে ২০০ টাকা, বাসে ২৮০ টাকা, চার চাকার ট্রাকে ২০০ টাকা, ছয় চাকার ট্রাকে ৩০০ টাকা এবং কাভার্ড ভ্যানে ৪৫০ টাকা হারে টোল আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যাশিত যানবাহন না থাকায় আয়ও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আপত্তির কারণে র্যাম্প নির্মাণে দীর্ঘদিন জটিলতা ছিল। বর্তমানে সেই জটিলতা অনেকটাই কেটে গেছে। মোট ৯টি র্যাম্পের মধ্যে পাঁচটির নির্মাণ শেষ হয়েছে। নিমতলা মোড়ে ওঠানামার দুটি, টাইগারপাসে আমবাগানমুখী একটি এবং ফকিরহাটে নামার একটি র্যাম্প প্রস্তুত রয়েছে। তবে টোল বুথ নির্মাণ শেষ না হওয়ায় এখনো সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘আগামী নভেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। টোল বুথ নির্মাণ শেষ হলে ধাপে ধাপে র্যাম্পগুলোও যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।’
সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে র্যাম্প নির্মাণে থাকা জটিলতা দূর করেছেন। তার আশা, চলতি বছরের মধ্যেই সব র্যাম্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কেকে/এলএ