দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের হার অনেক তীব্র। গরমের মধ্যে টানা লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে আছেন সব স্তরের মানুষ। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারছেন না। চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফুটবল বিশ্বকাপ চলায় টেলিভিশনে খেলা দেখতে না পেরে বহু মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, কর্মীদের মারধর, বিক্ষোভ-সমাবেশের মতো ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও অনেকটা অসহায়। তারা চাইলেও কিছু করতে পারছেন না।
অতিষ্ঠ মৌলভীবাজারের জনজীবন
দিন-রাত, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ মৌলভীবাজারের জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। চরম ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। মৌলভীবাজার জেলায় গত দুই সপ্তাহ ধরে লোডশেডিং মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও খারাপ।
শ্রীমঙ্গলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নাইমা বলেন, ‘পরীক্ষা শুরু, কিন্তু বাতি নেই, ফ্যান নেই। এ গরমে পড়াশোনার যা অবস্থা, তা কাকে বলব?’ অভিভাবক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দুপুর, বিকাল এবং সন্ধ্যার পর বারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এমনকি গভীর রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় সারারাত অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে কাটছে।’ মৌলভীবাজার শাহ মোস্তফা রোডের বাসিন্দা মুখর্শেদ আলম বলেন, ‘৮-১০ দিন ধরে লোডশেডিং সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
শ্রীমঙ্গলের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টায় ৭-৮ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে অতিষ্ঠ জনজীবন।’ শ্রীমঙ্গলের নুর ফুডস হোটেলের স্বত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। সারা দিনে অন্তত ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে।’
কমলগঞ্জের গৃহিণী সখিনা বেগম বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যার পর ছেলেকে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। এভাবে রাতভর কয়েক দফা বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।’
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা বেড়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি পুরোপুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’ এদিকে, কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহের পর মৌলভীবাজার জেলায় এক পশলা বৃষ্টির দেখা মিলেছে, যা ভ্যাপসা গরমের মধ্যে জনমনে খানিকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
সিলেটে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা
সিলেটে তীব্র গরম আর ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন। এ অবস্থার মধ্যে শনিবার সিলেটে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে সকাল থেকেই কড়া রোদ ও দাবদাহের কারণে বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ।
নারায়ণগঞ্জে কমেছে শিল্পকারখানার উৎপাদন
শিল্পের জেলা নারায়ণগঞ্জে ক্রমাগত লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে এসব এলাকার বাসিন্দাদের। সেই সঙ্গে কমেছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। জামালপুরে পিডিবির আওতাভুক্ত এলাকায় লোডশেডিং কিছুটা সহনীয় থাকলেও পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন। কয়েকটি স্থানে বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। নেত্রকোণার ১০ উপজেলার গ্রামগুলোতে দিনের অর্ধেক সময়েই বিদ্যুৎ মিলছে না। নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘সরবরাহ কম থাকায় এক সপ্তাহ ধরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।’
ময়মনসিংহে মৎস্য ও পোলট্রি খামারে বিরূপ প্রভাব
ময়মনসিংহে লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাত মৎস্য ও পোলট্রি খামারে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এদিকে, সেচ মৌসুমের পর থেকে যশোরের গ্রামাঞ্চলেও বেড়েছে লোডশেডিং। মেহেরপুরে গত কয়েক দিন ধরে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। দিনাজপুরেও গত কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে লোডশেডিং ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সম্প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এলাকাবাসী। সাব-স্টেশনে ঢুকে এক কর্মকর্তাকে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ধানুয়া গ্রামে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে বিদ্যুৎকর্মীদের ওপর হামলা করে গ্রামবাসী।
লালমনিরহাটের আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি ঝড়ে পল্লী বিদ্যুতের ১০ এমভিএ পাওয়ার ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ায় কমলাবাড়ী, পলাশী, ভেলাবাড়ী, গোড়ল, চলবলা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
আদিতমারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মুহাম্মদ আব্দুল ফাত্তাহ বলেন, ‘বজ্রপাতে ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার পর প্রায় ২২ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বজ্রপাতে পল্লী বিদ্যুতের আদিতমারী ২ সাব-স্টেশনের ট্রান্সফরমারটি বিকল হয়ে যায়।’
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘টানা বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।’
কেকে/এলএ