যেন ঘুষের টোল প্লাজায় পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীন ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশনটি। এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের অতীত ইতিহাসে তদন্ত বা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নজির নেই। ফলে, বনজসম্পদ পরিবহনে তদারকি ও অবৈধ কাঠ পাচার রোধে স্টেশনটির ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও এই চেক স্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘুষের টোল প্লাজা’ হিসেবে কাজ করছে।
এ স্টেশনটিতে বিভিন্ন পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রকাশ্য ঘুষের প্রতিযোগিতা চলে। স্টেশন অফিসার পদে পদায়ন পেতে চাইলে সর্বোচ্চ ঘুষদাতা হতে হবে। অন্যথায় জুটবে না স্টেশনটির চাবি। গত কয়েক মাস আগে স্টেশনটির স্টেশন অফিসার পদে পদায়ন পান ডেপুটি রেঞ্জার শামীম রেজা।
বন বিভাগের বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিনি ২০ লাখ টাকা বন বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ দিয়ে স্টেশন কর্মকর্তার চেয়ার বাগিয়ে নিয়েছেন। এখন ঘুষের টাকা সুদে-আসলে তুলতে মরিয়া এ কর্মকর্তা। ধুমঘাট চেক স্টেশনে একজন স্টেশন অফিসারের পদায়ন এক বছরের জন্য। এই এক বছরের মধ্যে স্টেশনটি থেকে ৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে উপার্জন তেমন কোনো জটিল কাজ নয় বলে বন বিভাগের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
পরিবেশ সচেতন মহল বলছে, চেক স্টেশনে পোস্টিং পেতে গেলে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করতে হয়। ফলে এ ঘুষের টাকা সুদে-আসলে উত্তোলনের জন্য ঘুষ গ্রহণের বিকল্প নেই। কাগজপত্র চেক করার নামে বনজদ্রব্য ও কাঠ বহনকারী ট্রাক থেকে স্টেশন অফিসারের চাঁদাবাজি দুর্নীতি হলেও বন বিভাগ এটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আমলে নিচ্ছে না। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় মাঠপর্যায়ে এসব দুর্নীতির তদন্ত হয় না। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট ধুমঘাট চেক স্টেশনটিতে বিভিন্ন পদে পদায়ন লোভনীয় করে তুলেছে। এতে নির্বিচারে বন থেকে কর্তন করা গাছ অবাধে পাচার হচ্ছে ধুমঘাট স্টেশনে ঘুষের টাকা দিয়ে।
অনুসন্ধান বলছে, কাঠ পরিবহনের ট্রানজিট পাস (টিপি) থাকার পরও প্রতিটি পরিবহনকে ধুমঘাট স্টেশনে ঘুষ দিতে হয়। টিপিপ্রতি প্রতিটি ট্রাকচালককে বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হয় ৬ হাজার ৮০০ টাকা। টিপি ছাড়া অবৈধভাবে কাঠ পাচার করা (ওটি) প্রতিটি ট্রাকচালককে ঘুষ দিতে হয় ৬-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
অহরহ এ স্টেশনটি ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করে বনের কাঠ পাচার করা হচ্ছে। কালেভদ্রে মামলা দায়ের ও কাঠ জব্দের ঘটনা ঘটে। স্টেশনটির অদূরে বারইয়ারহাটে ৯টি ও শান্তিরহাটে অবস্থিত ৪টি করাতকল রয়েছে। প্রতিটি করাতকল মালিককে ধুমঘাট স্টেশন অফিসারকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। আসবাবপত্র পরিবহনের জন্য পরিবহন সার্ভিসগুলোকে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় ধুমঘাট স্টেশন অফিসারকে। এ ছাড়া প্রতিটি বালুবাহী ট্রাকচালককে ধুমঘাট স্টেশন অফিসারকে ট্রাকপ্রতি ঘুষ দিতে হয় ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত। বারইয়ারহাটে অবস্থিত তিনটি বাঁশের ডিপো থেকে প্রতি মাসে দেড় লাখ টাকা ঘুষের টাকা ঢুকছে স্টেশন অফিসার শামীম রেজার পকেটে।
অনুসন্ধান আরও বলছে, ধুমঘাট স্টেশন থেকে উত্তোলিত ঘুষের টাকা প্রতি মাসে পৌঁছে যাচ্ছে বন বিভাগের বিভিন্ন পদের কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পকেটে। প্রতিটি টিপি থেকে আদায় করা ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারায় চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পকেটে ৩০০ টাকা, বিভাগীয় দপ্তরের স্টাফরা ৫০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক ২০০ টাকা, চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের দপ্তরে মাসে ১ লাখ টাকা এবং প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তরে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষের টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ফিরিঙ্গিবাজার বন বিভাগের রেস্ট হাউসে অতিথি আপ্যায়নের মাসিক খরচ পৌঁছে যাচ্ছে ধুমঘাট স্টেশন অফিসারের পক্ষ থেকে।
চট্টগ্রাম জেলার কাঠ ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন জানান, কাঠ পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ধুমঘাট স্টেশনে হয়রানি করা হচ্ছে। কাগজপত্রে ত্রুটি না থাকলেও ত্রুটির অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে দীর্ঘক্ষণ ট্রাক আটকে রাখার ঘটনা ঘটে।
একই রকম অভিযোগ করেন বান্দরবান জেলার কাঠ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও নাটক মঞ্চস্থ করে ধুমঘাট স্টেশন থেকে হয়রানি করা হচ্ছে। ঘুষের টাকা না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক আটকে রাখা হয়। মামলার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে ধুমঘাট চেক স্টেশন অফিসার শামীম রেজা বলেন, ‘তিনি ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নেননি বলেও দাবি করেন।’
ধুমঘাট স্টেশনে বৈধ কাঠ ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালকদের নানাভাবে হয়রানি করে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ট্রানজিট পাস (টিপি) থাকার পরও তাদের বাধ্য করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ আপনি পেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. মাহদী হাসান বলেন, ‘এমন কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো আমি পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লিখিত অভিযোগ করলে কাঠ ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালকদের নানাভাবে হয়রানি করা হতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা আপনি নিশ্চিত করতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
ধুমঘাট স্টেশন থেকে চাঁদাবাজির টাকা বন বিভাগের বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে যাচ্ছে। প্রতি মাসে আপনার জন্যও বরাদ্দ রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘কাঠ ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোষ লুকাতে অনেক ধরনের কথা বলে থাকেন। তবে আপনার কাছ থেকে অনেক ধরনের তথ্য পেলাম। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে, এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘তিনি সাময়িকভাবে এ বিভাগটির দায়িত্ব নিয়েছেন। কাঠ ব্যবসায়ী বা পরিবহনচালকরা লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এলএ