রোববার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৫ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুত করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ধুমঘাট ফরেস্ট স্টেশন ঘুষের টোল প্লাজা      ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ৯৪২টি আফটারশক      গ্রামে লোডশেডিংয়ের খড়গ      বেড়েই চলেছে ঋণের বোঝা      ইউএন-কপস সম্মেলনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      কানাডার বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ, কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কো      
দেশজুড়ে
ভুয়া বিল ভাউচারে স্কুলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাকাটার নামে গোপনে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে এবং একই নম্বরের একাধিক বিল বারবার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গোসাই জোয়াইর আজিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে। এছাড়া বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সরকারি বরাদ্দের ১ লাখ টাকার পুরোটাই আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক মামুনের বিরুদ্ধে।

ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের বেশ কিছু প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

এর মধ্যে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষক (ক্যাশিয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষার কাগজ ও প্রশ্নপত্র কেনার নামে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির ১৮৪ নম্বরের চারটি ভুয়া বিল তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল থেকে মোট ৮৬ হাজার ৭০০ টাকা আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। এর মধ্যে মার্চ মাসে ১৮৪ নম্বর বিলে ১৮ হাজার ৩০০ টাকা, জুন মাসে ২৪ হাজার ৭০০ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ২৪ হাজার ৭০০ টাকা এবং অক্টোবর মাসে একই ১৮৪ নম্বর বিল দেখিয়ে ১৯ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাবেক সেক্রেটারি শামীম আল মামুন বলেন, “একই নম্বরের একাধিক বিল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি বিল বইয়ের প্রতিটি পাতায় পৃথক বিল নম্বর থাকে। যদি কেউ একই বিল নম্বরসহ একাধিক বিল জমা দিয়ে থাকেন, তবে বুঝতে হবে এগুলো ভুয়া বা ফেক বিল। ভুয়া বিল তৈরি করে কেউ প্রতারণার সুযোগ নিলে এর দায়-দায়িত্ব তার, আমাদের সমিতির নয়।”

একইভাবে পরীক্ষার কাগজ ক্রয়ের কথা দেখিয়ে উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের নামে ৮৮০ নম্বরের তিনটি ভুয়া বিল তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল থেকে মোট ৬১ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। এর মধ্যে ২০২২ সালের মার্চ মাসে ১০ হাজার টাকা, জুন মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং অক্টোবর মাসে ২৬ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর বলেন, বিষয়টি দেখে জানাতে হবে। দুই দিন পর তিনি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে আজিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের কাগজ ক্রয়ের কয়েকটি বিল পাঠান। কিন্তু প্রতিবেদকের হাতে থাকা প্রধান শিক্ষক মামুনের দাখিল করা বিলের সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল পাওয়া যায়নি। যাচাই-বাছাই শেষে দেখা যায়, জাহাঙ্গীরের পাঠানো বিলগুলো উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের লোগো ও ঠিকানা ব্যবহার করে নতুন করে কম্পিউটারে তৈরি করে রঙিন প্রিন্ট করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

এখানেই শেষ হয়নি প্রধান শিক্ষক মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে ১ লাখ টাকার অনুদান দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু যন্ত্রপাতি না কিনে ‘মেসার্স শাহরিয়ারস’ নামে ঢাকার টিকাটুলির ঠিকানাসংবলিত একটি কম্পিউটারের দোকানের ভুয়া প্যাড তৈরি করে তাতে দরপত্র প্রস্তুত করে বিল হিসেবে দেখিয়ে পুরো ১ লাখ টাকাই আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ১ লাখ টাকার বিল হিসেবে যে কাগজ বিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়, সেটি মূলত কোনো বিল নয়; এটি একটি দোকানের দরপত্র, যাতে যন্ত্রপাতির তালিকা দেখিয়ে ১ লাখ ৩ হাজার টাকার প্রস্তাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে ‘মেসার্স শাহরিয়ারস’ নামের ওই দোকানের মালিক আনোয়ার বলেন, “এ নামে আমার কোনো দোকান নেই। ট্রেড লাইসেন্সও নেই। আমি এ পর্যন্ত কোনো টেন্ডারে অংশ নিইনি। সুতরাং কোনো বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে বিল করে ১ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রশ্নই ওঠে না। যে শিক্ষক এমন কাজ করেছে, সে শিক্ষক নামের কলঙ্ক।”

নিজের নাম জড়িয়ে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক মামুনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন আনোয়ার।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ের পুকুর লিজের ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে।

একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির ২ লাখ ১ হাজার ৮৭০ টাকার পুরোটাই আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিল জমা দেওয়ার এক বছর আগেই প্রধান শিক্ষকের অনুমোদন, সমিতির আন্দোলনের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন, প্রিন্টারের কালি, কম্পিউটার মেরামত, টেলিটক, এনটিআরসিএ, বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী প্রভৃতির নামে দাখিলকারীর নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষরবিহীন ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল থেকে মোট ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪০১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নিজেই ক্যাশিয়ার ও অনুমোদনকারী হওয়ায় এসব বিল-ভাউচারের কোনোটিতেই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মামুন বলেন, “এগুলোর সব সত্য না। তবে ভুলভ্রান্তি হতে পারে।”

বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার নামে ভুয়া দরপত্র দেখিয়ে ১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “ওইটা ওই রকমই পাইছি। কিছু ভুলভ্রান্তি হইতে পারে। সব অভিযোগের বিষয়ে অডিট পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়কের কাছে বলেছি, বিষয়টা সমাধান করার জন্য।”

শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য বিদ্যালয় তহবিল থেকে টাকা নেওয়া যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সব শিক্ষকরা গেছিল, তাই এইটা করা হইছে।”

অন্যদিকে ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকাকালে প্রধান শিক্ষক মামুনের যোগসাজশে পুকুর লিজের ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে সহযোগী শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে। এছাড়া বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট তৈরি না করে ভুয়া বিল জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন, বিদ্যালয়ের বাইরে ব্যক্তিগত দাওয়াত, ব্যক্তিগত মারামারির ঘটনায় এলাকায় মাইকিং ও গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য বিদ্যালয় থেকে টাকা উত্তোলন, শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে অংশ নেওয়া, শিক্ষকদের বেতন দেওয়া এবং বিল জমার এক মাস আগেই অনুমোদন দেখানোসহ ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে সুবীর চন্দ্র রায় বলেন, “আমি তো টাকা নেই নাই। আমি যত দিন ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে ছিলাম, শুধু বিল-ভাউচারের টাকা দিয়েছি। কিছু হয়তো এদিক-সেদিক আছে। প্রমাণ হলে সেগুলো আমি দিয়ে দেব।”

এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক মামুনের যোগসাজশে করণিক জহিরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ ও প্রশংসাপত্র তৈরি করে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করে লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে টেলিফোনে জহিরুল ইসলাম এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলতে চান এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেন। এর আগে প্রধান শিক্ষক মামুন, সুবীর চন্দ্র রায় ও জহিরুল ইসলামের দুর্নীতি নিয়ে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর এক সভায় জহিরুলসহ অভিযুক্তরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির তৎকালীন সভাপতি এস. এম. নূরুল আলম রেজভী বলেন, “বিষয়টি আমি জানি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর অভিভাবক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে গঠিত অডিট ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে। তারা টাকা পরিশোধ করার কথা বললেও তা পরিশোধ করেননি। এসব ভুয়া বিল-ভাউচারের কোনোটিতেই আমার কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। আমি দায়িত্বে থাকাকালে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে শিক্ষকদের বকেয়া বেতন ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করেছি। আর এখন শিক্ষকদের ১১ মাসের বেতন বকেয়া আছে বলে শুনেছি। অথচ তারা প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সবার উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন মিয়া বলেন, “আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন জানলাম। এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বা কেউ আমার কাছে অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।”

উল্লেখ্য, এর আগে এলাকায় সুবীর চন্দ্র রায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মদদে মানববন্ধন থেকে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মামুন ও সুবীরের বিরুদ্ধে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  অভিযোগ   ভুয়া বিল   টাকা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close