বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। পরিবার-পরিজন নিয়ে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর বালুকাবেলায় মেতে ওঠেন তারা। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অব্যবস্থাপনা ও নানা ধরনের ভোগান্তির কারণে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ছে।
সৈকতের বালিয়াড়িতে গরুর অবাধ বিচরণ এখন দেশ-বিদেশে আলোচনার বিষয়। সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টসহ প্রধান প্রধান স্পটে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় গরু, ছাগল ও কুকুরের দল। গত শুক্রবারও সুগন্ধা পয়েন্টে বালিয়াড়ির ওপর একঝাঁক গরুর বিচরণ দেখা গেছে। দৃশ্যটি দেখে অনেকের কাছেই এটি সমুদ্রসৈকতের চেয়ে গোচারণভূমি বলেই মনে হয়েছে।
কিছুদিন আগে এক বিদেশি পর্যটক কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়িতে গরুর বিচরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিষয়টি বিশ্বপর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সমুদ্রসৈকত পুরো বাংলাদেশের গর্ব। এর সৌন্দর্য ও মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম অবহেলার কারণেই আজ বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
পর্যটকদের অভিযোগ, সৈকতে শুধু গবাদিপশুর উৎপাতই নয়, রয়েছে আরও নানা ধরনের ভোগান্তি।
ফটোগ্রাফার ও হকারদের হয়রানি
ছবি তোলার নামে কিছু ফটোগ্রাফারের জোরাজুরি এবং ভ্রাম্যমাণ হকার ও ঝিনুক ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত উৎপাত পর্যটকদের অতিষ্ঠ করে তুলছে।
দিনের বেলায় বিশৃঙ্খলা
সৈকতজুড়ে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাটের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যক্তিস্বার্থে সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করছেন।
রাতের নিরাপত্তাহীনতা
সন্ধ্যার পর থেকেই সৈকত এলাকায় ছিনতাইকারীদের উৎপাত বাড়ে। পর্যাপ্ত আলোর অভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কমে যাওয়ায় রাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক সুমন বলেন, ‘প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই কক্সবাজারে এসে হতাশ হতে হয়েছে। বালিয়াড়িতে গরু ঘুরছে, ফটোগ্রাফাররা হয়রানি করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়ছে না। মনে হয় সৈকতটির যেন কোনো অভিভাবক নেই।’
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য বিচকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এত জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকার পরও সৈকতের এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও পর্যটন-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘সৈকতে গবাদিপশুর বিচরণ বন্ধে আমরা জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। পশুর মালিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। এরপরও তারা গরু-ছাগল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সৈকতে পাওয়া মাত্রই সেসব পশু জব্দ করা হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং হয়রানি রোধে মোবাইল কোর্টের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
প্রকৃতির এই অনন্য সম্পদ এবং দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত কক্সবাজারকে রক্ষায় কেবল আশ্বাস নয়, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চান সচেতন মহল।
কেকে/ এমএস