মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
২৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: গ্রামপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে সরকার      এনসিপির সমাবেশে ককটেল হামলার নিন্দা, দোষীদের শাস্তির দাবি      সবুজ বিদ্যুতে নতুন কৌশল      ৬ দিনের বিরতির পর আবার বসছে সংসদ অধিবেশন      সাভারে এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ      টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি      ১৪২ রানের জবাবে ১১৬, লজ্জার হার বাংলাদেশের      
বেগম রোকেয়া
সরকারি চাকরি ছেড়ে গ্রামীণ নারীদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন প্রীতি
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ধুলজুরী গ্রামের নিভৃত জনপদে নীরবে ঘটছে এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্প। যে গ্রামে একসময় অধিকাংশ নারী ঘর-সংসারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, সেখানে আজ অনেকেই নিজেদের আয় করছেন, উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছেন। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি। 

নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা এবং স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা থাকা সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন গ্রামের নারীদের নিয়ে কাজ করার পথ। তার বিশ্বাস ছিল, নারীদের হাতে কাজ তুলে দেওয়া গেলে শুধু একজন নারী নয়, বদলে যাবে একটি পরিবার, একটি সমাজ। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় তার স্বপ্নযাত্রা।

জানা যায়, ২০২৪ সালে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে মাত্র ১০ জন নারীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নকশীকাঁথা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’। শুরুটা ছিল খুবই ছোট পরিসরে। নিজের বাড়ির একটি কক্ষে কয়েকজন নারীকে নিয়ে সুঁই-সুতা আর কাপড়ের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল নকশীকাঁথা তৈরির কাজ। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ একটি বহুমুখী নারী উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। 

বর্তমানে প্রায় ১৪০ জন নারী সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রমে। নকশীকাঁথা তৈরির পাশাপাশি গড়ে উঠেছে উদ্যমী মহিলা সমবায় সমিতি লিমিটেড, পাট হস্তশিল্প, মাশরুম চাষ এবং মৎস্য খামারভিত্তিক কর্মসংস্থানের মতো নানা উদ্যোগ। ফলে নারীদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে বহুমুখী আয়ের সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। 

সরেজমিন ধুলজুরী কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেক বাড়িই যেন ছোট ছোট উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কোথাও নারীরা ব্যস্ত নকশীকাঁথার সূক্ষ্ম নকশা ফুটিয়ে তুলতে, কোথাও পাটের ব্যাগ, ঝুড়ি, শোপিস ও বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরিতে। আবার কেউ মাশরুম উৎপাদন কিংবা মাছ চাষের মাধ্যমে সংসারের বাড়তি আয় করছেন। অনেক নারী প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাজ করেই মাস শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় করছেন, যা তাদের পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে।

প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত নারী কর্মী মাহমুদা আক্তার বলেন, আগে সংসারের কাজের বাইরে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। সবকিছুর জন্য পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন নিজের আয় আছে। সংসারের খরচে সহযোগিতা করতে পারছি। নিজের প্রয়োজনও নিজেই পূরণ করতে পারি। এতে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।

আরেক সদস্য ফারিয়া জাহান বলেন, এ উদ্যোগ আমাদের শুধু আয় দেয়নি, দিয়েছে আত্মমর্যাদা। আগে পরিবারের সিদ্ধান্তে আমাদের মতামতের তেমন মূল্য ছিল না। এখন আমাদের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছি।

উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি বলেন, সরকারি চাকরি করার সময়ই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে গ্রামের অসংখ্য নারী দক্ষ হলেও কাজের সুযোগের অভাবে তাদের প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে না। তাই চাকরি ছেড়ে পুরো সময় নারীদের নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য শুধু কয়েকজন নারীকে কর্মসংস্থান দেওয়া নয়। আমি চাই গ্রামের প্রতিটি নারী নিজের পায়ে দাঁড়াক। একজন নারী স্বাবলম্বী হলে তার সন্তান, পরিবার এবং পুরো সমাজ উপকৃত হয়। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা একটি স্থায়ী কার্যালয়ের অভাব। নিজের বাসার ছোট একটি কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। উদ্যোক্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও প্রশিক্ষণ, পণ্য সংরক্ষণ ও বৈঠক করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই।

প্রীতি বলেন, এ পর্যন্ত নিজের অর্থায়নেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছি। অনেক নারী উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ইউনিসেফের সহযোগিতায় শিশুদের জন্য কিছু শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে নারী উদ্যোক্তারা কাজ করার সময় তাদের সন্তানদের রাখার জন্য একটি নিরাপদ টয় কর্নার বা শিশু যত্নকেন্দ্র না থাকায় অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।

প্রীতির স্বামী রুবায়েদ হোসেন রায়হান সাকিব বলেন, আমার স্ত্রী নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। তার এ উদ্যোগ আমাদের পরিবারের জন্যও গর্বের বিষয়। বর্তমানে প্রায় ৩০ জন নারী মৎস্য চাষে, ৩০ জন মাশরুম উৎপাদনে এবং শতাধিক নারী নকশীকাঁথা তৈরির কাজে যুক্ত আছেন। আমরা চাই এই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ুক।

তিনি আরও জানান, শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে প্রায় ৫০০টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। 
স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগের ফলে অনেক নারীর জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা পুরোপুরি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, এখন তারা নিজেরাই সংসারের ব্যয় বহন করছেন। অনেক পরিবারে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে নারীদের উপার্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

হোসেনপুর ইউএনও কাজী নাহিদ ইভা বলেন, উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতির উদ্যোগটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তার একটি স্থায়ী কার্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে সামিয়া নাছরিন প্রীতির এই উদ্যোগ শুধু হোসেনপুরেই নয়, কিশোরগঞ্জের অন্যান্য উপজেলাতেও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। গ্রামের নারীদের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই যাত্রা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে বলেও তারা আশাবাদী।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বেগম রোকেয়া- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close