কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে টানা অতিভারী বর্ষণের কারণে একের পর এক ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। গত সোমবার তিনটি ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে আটজন নিহত হওয়ার পর বুধবার (৮ জুলাই) বিকালে আরও একটি ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একটি মহিলা হেফজখানার দেয়াল ধসে চার কিশোরী শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে চার শিশু ও চার মাদ্রাসাছাত্রীসহ মোট ১২ জন রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন।
একের পর এক এই দুর্ঘটনায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ক্যাম্পজুড়ে লাখো রোহিঙ্গার মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ের খাড়া ঢাল ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী হাজারো পরিবার এখন মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) জানায়, বুধবার বিকেল আনুমানিক ৩টা ৪৫ মিনিটে উখিয়ার ইরানি পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর এ-৩ ব্লকে অবস্থিত খতিজাতুল মহিলা হেফজখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। টানা বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে পাহাড়ের মাটি ধসে হেফজখানার একটি দেয়ালের ওপর আছড়ে পড়লে দেয়ালটি ভেঙে ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ওপর ধসে পড়ে। এতে সাতজন ছাত্রী আহত হয়।
পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও এপিবিএনের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক চারজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা হলেন রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) ও উমাইসা বিবি (১৩)। আহত অপর তিন ছাত্রী—আসরা (৯), বেগম জান (১৫) ও ফারেসা বিবি (১২)—হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী, ১১ নম্বর বালুখালী ও ৭ নম্বর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে বসতঘরের ওপর ধসে পড়লে চার শিশু ও দুই নারীসহ আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ অভিযানে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
সোমবারের ঘটনায় নিহতরা হলেন ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস। ১১ নম্বর বালুখালী ক্যাম্পে নিহত হন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এছাড়া ৭ নম্বর কুতুপালং ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত হয় সাত বছর বয়সী একরাম।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
৮ এপিবিএনের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের পাদদেশের মাটি আলগা হয়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে এপিবিএন ও ক্যাম্প ভলান্টিয়াররা কাজ করছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছিল। নতুন দুর্ঘটনা এড়াতে সবাইকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকেই পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও সীমিত জায়গার কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিন কক্সবাজার অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/ এমএস