বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার মো. শামীম রেজা। বর্তমানে আছেন চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশন অফিসারের চেয়ারে। বনের গাছ বিক্রি ও পাচারে জুড়ি নেই এ কর্মকর্তার। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া রেঞ্জ অফিস ভবন বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। উন্নয়ন কাজ না করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ ও সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে বাকিতে মালামাল কিনে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।
কর্মজীবনে বহুমুখী দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ এই কর্মকর্তার ঝুড়ি। সরকারি রাজস্বের টাকা আত্মসাৎ ও অহরহ সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করা এই কর্মকর্তা বন বিভাগে দাপটের সঙ্গে চাকরি করে যাচ্ছেন। অথচ বন বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা দুর্নীতিগ্রস্ত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ। উল্টো গত বছর মো. শামীম রেজা ফরেস্টার থেকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। চলতি বছর চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশনে বাগিয়ে নিয়েছেন প্রাইজ পোস্টিং।
চট্টগ্রাম উপকূল বন বিভাগের নথি বলছে, বিভাগটির কুতুবদিয়া রেঞ্জে ২০২১-২০২২ আর্থিক সনে আলী আকবর ডেইল বিটে মাচাং টাইপ ব্যারাক ও ২০২২-২৩ আর্থিক সনে মাটি ভরাটসহ অ্যাপরোচ রোড নির্মাণ করার কথা ছিল। রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন মো. শামীম রেজা। ৩২ লাখ টাকার বেশী উন্নয়নমূলক কাজ নামমাত্র ও মানহীন করে তিনি বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। সরকারি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বহাল তবিয়তে চট্টগ্রাম উপকূল বন বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাসনাবাদ রেঞ্জে বদলি হয়ে যান। পরবর্তীতে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি তার সাবেক কর্মস্থলের উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করেননি।
২০২২-২৩ আর্থিক সনে আলী আকবর ডেইল বিট অফিসের পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে মাটি ভরাটসহ অ্যাপরোচ রোড নির্মাণ করার কথা ছিল। ৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দের ওই কাজে মাত্র ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করেন তিনি। নামমাত্র একটি অ্যাপরোচ রোড করলেও মাটি ভরাট না করে ৪ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেন। ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দের কাজ অসম্পন্ন রেখে তিনি কুতুবদিয়া রেঞ্জ থেকে বদলি হয়ে যান।
বন বিভাগের নথি আরও বলছে, ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন চট্টগ্রাম উপকূল বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে বিভাগটির নকশাকার এস এম শামীম হোসেন ২০২১-২০২২ আর্থিক সনে আলী আকবর ডেইল বিটের মাচাং টাইপ ব্যারাক ও ২০২২-২৩ আর্থিক সনে মাটি ভরাটসহ অ্যাপরোচ রোড নির্মাণ কাজ অগ্রগতির তথ্য সংগ্রহের জন্য এসে কাজ অসম্পন্ন পান। পরবর্তীতে পুনরায় সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে বিগত ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর অসম্পন্ন কাজের তালিকা প্রস্তুত করেন। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করার জন্য বারবার তারিখ প্রদানের পরেও কাজ সম্পন্ন করেননি মো. শামীম রেজা।
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি। দীর্ঘ দুই বছর চার মাস তিনি কুতুবদিয়া রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করেও কোনো ক্যাশ বই ও কার্য পরিমাপক বই লিপিবদ্ধ করার তথ্য প্রমাণ নেই। চলতি বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম উপকূল বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শেখ আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ অসম্পন্ন থাকার তথ্য-প্রমাণ পান।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাসনাবাদ রেঞ্জে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মচারীরা জানান, মো. শামীম রেজা হাসনাবাদ রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালীন সুফল প্রকল্পে অংশীজনদের প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কাজের বরাদ্দের ৩ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেন। পরে তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) টাকার ব্যবস্থা করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। হাসনাবাদ রেঞ্জে থাকাকালীন মো. শামীম রেজার বিরুদ্ধে বনের মাটি ও গাছ বিক্রিসহ বহুমুখী দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তার অনুমতি নিয়ে সংঘবদ্ধ গাছ চোর চক্র গাছ কাটতে গেলে অভিযানে যায় রেঞ্জের কর্মচারীরা। পরে কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে তোপের মুখে পড়েন তৎকালীন রেঞ্জ অফিসার মো. শামীম রেজা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ডেপুটি রেঞ্জার মো. শামীম রেজার বহুমুখী দুর্নীতি তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন আরিফ খান নামে একজন সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি চিহ্নিত করে অহরহ সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব খবর আমলে নিচ্ছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজ দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে এসব দুর্নীতির তদন্ত করাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এতে দুর্নীতি তদন্ত করতে গিয়ে পুনরায় দুর্নীতি সংগঠিত হচ্ছে। ডেপুটি রেঞ্জার শামীম রেজা বন বিভাগে একাই দুর্নীতি করছেন তা নয়। তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়া কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তার অধস্তন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের শাস্তির আওতায় আনতে তিনি লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানান।
চট্টগ্রাম কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলায় স্কেভেটর ও ডাম্পার ট্রাক ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, ডেপুটি রেঞ্জার শামীম রেজার কাছে তিনি ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা পান। দেই-দিচ্ছি করে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।
একই উপজেলার শাহ জব্বারিয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. ইছাহাক জানান, গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে শামীম রেজার কাছে পাওনা টাকা চেয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি কিছুদিন আগে বন বিভাগের অফিসাররা জেনে গেলে কিছু টাকা পরিশোধ করেন। এখনো তিনি ২৪ হাজার টাকা পান।
কুতুবদিয়া উপজেলার স্থানীয় ঠিকাদার হেফাজ উদ্দিন জানান, তিনি শামীম রেজার কাছে দুই বছরের বেশি সময় ধরে টাকা পান। বিষয়টি বন বিভাগে চাউর হলে সম্প্রতি ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। এখনো তিনি ৩৫ হাজার টাকা পান।
এ ব্যাপারে ডেপুটি রেঞ্জার মো. শামীম রেজা বলেন, কুতুবদিয়ায় কয়েকজন তার কাছে টাকা পান এটা ঠিক। তিনি পরিশোধ করবেন। পুরাতন রেঞ্জ অফিস তিনি বিক্রি করেননি। উন্নয়ন কাজে বরাদ্দের টাকা তিনি সঠিকভাবে খরচ করেছেন, আত্মসাৎ করেননি। এ ছাড়া সুফল প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেননি বলেও জানান।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম উপকূল বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, কুতুবদিয়া রেঞ্জে বরাদ্দের টাকা সঠিকভাবে খরচ হয়েছে কি না তিনি তদন্ত করেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। এটি অনিয়ম। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় শামীম রেজাকে তাগাদা দিয়ে তিনি অবশিষ্ট কাজ করিয়ে নিয়েছেন। এখনো কোনো কাজ অবশিষ্ট আছে কি না তদন্ত করে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।
কেকে/ এমএস