বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ব্যয়সংকোচনে কঠোর সরকার, গাড়ি কেনা ও বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা      রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মৃত বেড়ে ৮      রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৭ শিক্ষার্থীর মৃত্যু      ধানের শীষ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নিরাপত্তাকর্মীকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার      শনিবার ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী      পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় ৯ জুলাই      জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা স্থানীয় নির্বাচনে কাজে লাগাতে চায় ইসি      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভূমিকম্প : বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
মো. আবুল হাসানাত
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিশ্বজুড়ে বারবার কেঁপে উঠেছে ভূপৃষ্ঠ। কেন হয় এ ভূমিকম্প? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের গ্রহের গভীরে। পৃথিবীর বাইরের কঠিন আবরণ, অর্থাৎ লিথোস্ফিয়ার একটানা বা অখণ্ড নয়; বরং এটি এক ডজনের মতো বিশাল শিলাখণ্ডে বিভক্ত, যাদের বলা হয় টেকটোনিক প্লেট। এই প্লেটগুলো ভাসছে নিচের আংশিক নমনীয় ম্যান্টলের ওপর। কিন্তু এরা নড়ে কেন? পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত তাপশক্তি ম্যান্টলে ধীর পরিচলন স্রোত তৈরি করে। এর সঙ্গে সামুদ্রিক শৈলশিরার ঠেলা এবং অবনমিত প্লেটের টান যুক্ত হয়ে প্লেটগুলোকে বছরে কয়েক সেন্টিমিটার হারে প্রায় আমাদের নখ বাড়ার গতিতে অবিরাম চালিত রাখে। যেখানে দুটি প্লেট ধাক্কা খায়, পাশ কাটায় বা একে অপরের নিচে ঢুকে পড়ে, সেখানে চ্যুতি বরাবর জমা হয় বিপুল শক্তি। শিলার সহনক্ষমতা অতিক্রম করলে সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূকম্পন তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এই আকস্মিক শক্তি নিঃসরণের ফলই হলো ভূমিকম্প।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ অবস্থান করছে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা এ তিনটি সক্রিয় প্লেটের সংঘর্ষস্থলের কাছে। বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রয়েছে ডাউকি চ্যুতি, মধুপুর চ্যুতি, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ভাঁজবেষ্টনী ও সিলেট লিনিয়ামেন্ট। ইতিহাসও এ ঝুঁকির স্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। ১৭৬২ সালের বেঙ্গল-আরাকান (৮.৫), ১৮৯৭ সালের মহা আসাম (৮.০+, সিলেটে ৫৪৫ জন নিহত) এবং ১৮৮৫ সালে মধুপুর চ্যুতিতে ঘটা প্রায় ৭.৫ মাত্রার কম্পন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। উদ্বেগের বিষয়, মধুপুর চ্যুতিতে প্রায় ১৪০ বছর বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। ফলে সেখানে ভূত্বকের অভ্যন্তরে স্থিতিস্থাপক শক্তি সঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড দেশকে চারটি ভূকম্পন অঞ্চলে ভাগ (Seismic Zone) করেছে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিকম্পজনিত নকশাগত ঝুঁকির মাত্রা নির্দেশ করে। সর্বনিম্ন ঝুঁকির জোন-১ (Zone Coefficient, Z=0.12) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, যেমন রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল। মধ্যম মাত্রার জোন-২ (Z=0.20) মধ্যাঞ্চল, যার মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। অপেক্ষাকৃত তীব্র জোন-৩ (Z=0.28) চট্টগ্রাম অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ, এবং সর্বোচ্চ ঝুঁকির জোন-৪ (Z=0.36) উত্তর-পূর্বের সিলেট অঞ্চল। জোন যত উঁচু, নকশা বা নির্মাণকে হতে হবে তত শক্তিশালী।

২০২৫ সালটি ছিল ভয়াবহ বিশ্বে বড় ধরনের ১৬টি ভূমিকম্পে প্রাণ হারান প্রায় আট হাজার মানুষ। ২৮ মার্চ ২০২৫ মিয়ানমারের সাগাইং চ্যুতিতে স্ট্রাইক-সিপ ধরনের ৭.৭ মাত্রার কম্পনে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন; ঝাঁকুনি পৌঁছায় ব্যাংকক পর্যন্ত। ৩০ জুলাই রাশিয়ার কামচাটকায় সাবডাকশন অঞ্চলে ঘটে ৮.৮ মাত্রার মহাকম্পন । ২০২১ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প যা সুনামিও সৃষ্টি করে। সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের জালালাবাদের কাছে অগভীর ৬.০ মাত্রার এক ভূমিকম্পেই দুই হাজারের বেশি প্রাণ যায় কারণ মাটির দুর্বল ঘরবাড়ি। এ ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শুধু মাত্রা নয়, ভূমিকম্পের গভীরতা ও নির্মাণমানই নির্ধারণ করে ধ্বংসের পরিমাণ। হিমালয় অঞ্চলে (তিব্বত-নেপাল সীমান্তে) জানুয়ারি ২০২৫-এ ভারত-ইউরেশীয় সংঘর্ষজনিত ৭.১ মাত্রার কম্পনে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

২০২৬ সালও শান্ত থাকেনি। ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় সান সেবাস্তিয়ান চ্যুতিতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জোড়া ভূমিকম্প (৭.২ ও ৭.৫) আঘাত হানে; কারাকাস অঞ্চলে নিহত হন দুশতাধিক মানুষ। অন্যদিকে জাপানে বারবার শক্তিশালী কম্পন (এপ্রিল ২০২৬-এ সানরিকু উপকূলে ৭.৪, জুনে আরও ৭.২) সত্ত্বেও প্রাণহানি ছিল নগণ্য কঠোর নির্মাণবিধি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার কল্যাণে জাপান আজ ভূমিকম্প সহনশীল প্রকৌশলের বিশ্ব আদর্শ। প্রতিবেশী আসাম ও ভুটানেও এ সময়ে একাধিক কম্পন অনুভূত হয়েছে।

২১ নভেম্বর ২০২৫ নরসিংদীর মাধবদী উপকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন ৫.৭ মাত্রার (USGS অনুযায়ী ৫.৫) ভূমিকম্পে অন্তত ১০ জন নিহত ও ছয় শতাধিক আহত হন প্রায় তিন দশকে ঢাকার এত কাছে অনুভূত সবচেয়ে তীব্র কম্পন। এর কিছুদিন পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সাতক্ষীরা অঞ্চলে ৫.৩ মাত্রার কম্পনে বহু ভবনে ফাটল ধরে, আর ২২ জুন ২০২৬ ফের নরসিংদীতে ৪.৪ মাত্রার ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।

রাজউকের ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’ (Urban Resilience Project 2015-2024) বলছে, মধুপুর চ্যুতিতে ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন প্রায় ৪০ শতাংশ স্থাপনা ধসে পড়তে পারে। প্রাণহানি ছাড়াতে পারে দুই লাখ, আর্থিক ক্ষতি ২৫ বিলিয়ন ডলার। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, BNBC অমান্য করে নির্মাণ এবং ঢাকার বহু এলাকার নরম পলিমাটি (যা কম্পন বাড়িয়ে তোলে, অর্থাৎ Soil Amplification) এসব কারণ সম্মিলিতভাবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মূল ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ভয়াবহ হতে পারে পরবর্তী বিপদ অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস-বৈদ্যুতিক বিস্ফোরণ, মাটির তরলীকরণ, সড়ক-সেতু ধসে উদ্ধারে বিঘ্ন, বিশুদ্ধ পানির সংকট, রোগবালাই ও পরাঘাত। ঢাকার সংকীর্ণ রাস্তায় ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছানো, পর্যাপ্ত হাসপাতাল সক্ষমতা এবং ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিত সাড়াদান সবই আমাদের দুর্বল দিক।

জাপান দেখিয়েছে, ভূমিকম্প ঠেকানো না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণকাজ এবং ব্যাংকঋণ সব ক্ষেত্রেই BNBC অনুসরণ বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বিশেষত হাসপাতাল ও স্কুল রেট্রোফিট করতে হবে। প্রতিটি পরিবারে একটি জরুরি প্রস্তুতি কিট রাখা উচিত। ভারী আসবাবপত্র দেওয়ালে আটকান। কম্পনের সময় আতঙ্কিত না হয়ে নিচু হন, আশ্রয় নিন এবং ধরে থাকুন। হাতের কাছে একটি বাঁশি রাখুন, যাতে প্রয়োজনে উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। জানালা-কাচ থেকে দূরে থাকুন এবং লিফট কখনোই ব্যবহার করবেন না। কম্পন থামলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করে সুশৃঙ্খলভাবে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসুন।

প্রকৃতির এই বারবার সতর্কবার্তাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সর্বোত্তম উপায়। একইসঙ্গে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও প্রার্থনা আমাদের মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য ও প্রতিকূল সময় মোকাবিলার সাহসকে আরও দৃঢ় করে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডি আই ইউ)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close