কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম মুনিয়ারীকান্দা। গ্রামের সরু কাঁচা পথ ধরে এগোলে চারপাশজুড়ে সবুজের সমারোহ, পাখির ডাক আর গ্রামবাংলার চিরচেনা নিস্তব্ধতা। সেই শান্ত পরিবেশের মাঝখানে একটি সাধারণ টিনের বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি গ্রামের বাড়ির মতোই মনে হয়। কিন্তু বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই বোঝা যায়—এখানে সময় যেন থমকে আছে।
উঠোনে নীরবে বসে আছেন বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামান। ঘরের ভেতরে ছেলের স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে বসে আছেন মা। পাশে ছোট ভাই। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কথায়, স্মৃতিতে আর দীর্ঘশ্বাসে বারবার ফিরে আসে একটি নাম—সিফাতুল্লাহ।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে দোয়া করছেন বাবা। দোয়া শেষে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটির সঙ্গে নীরব ভাষায় কথা বলছেন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করলেও কণ্ঠের ভারী স্বর বলে দেয়, প্রায় এক বছর পরও শোকের ভার একটুও কমেনি।
কবরস্থান থেকে বাড়ি পর্যন্ত পুরো পথজুড়ে তিনি ছেলের নানা স্মৃতি শোনাতে থাকেন। কোথায় হাঁটতেন, কোথায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন, কোন গাছের নিচে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতেন—সবকিছু যেন এখনো তার চোখের সামনে ভাসে।
বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায়, একটি ঘরে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সিফাতুল্লাহর ব্যবহৃত কোরআন শরিফ, পাঠ্যবই, খাতা, পোশাক ও ব্যক্তিগত কিছু জিনিস। কেউ সেগুলো স্পর্শও করেন না। পরিবারের বিশ্বাস, এগুলোই এখন তাদের কাছে ছেলেকে অনুভব করার একমাত্র অবলম্বন।
প্রায় এক বছর আগে এই বাড়ির যে তরুণটি ধর্মীয় শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুলে একজন আলেম হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনি আর কোনো দিন ফিরবেন না—এই বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি পরিবার। উঠোনের প্রতিটি কোণ, বারান্দা, পড়ার টেবিল, আলমারি—সবকিছুতেই যেন তার উপস্থিতি রয়ে গেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সিফাতুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র, ধর্মপ্রাণ, দায়িত্বশীল ও প্রতিবাদী স্বভাবের একজন তরুণ। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে একজন বড় আলেম হবে, সমাজে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেবে, একদিন নিজের একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেই স্বপ্ন চিরতরে থেমে যায়।
আজ পরিবারের কাছে সিফাতুল্লাহ শুধু একজন হারানো সন্তান নন; তিনি একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত অধ্যায় এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষার প্রতীক।
শৈশব থেকেই আলেম হওয়ার স্বপ্ন
২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সিফাতুল্লাহ। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পরিবারের ইচ্ছা এবং নিজের আগ্রহ থেকেই মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু।
পরে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার সিএনবি জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। শিক্ষক, সহপাঠী এবং স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মেধাবী ও দায়িত্বশীল একজন শিক্ষার্থী।
পরিবার জানায়, নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াতেন। সময়মতো নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, ইসলামী বই পড়া এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। ছুটিতে বাড়ি এলে গ্রামের শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, তাদের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন এবং ধর্মীয় বিষয়ে উৎসাহ দিতেন।
বাবা নূরুজ্জামান বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছেলের মধ্যে নেতৃত্বের গুণ ছিল। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শিখেনি। ভুল দেখলে প্রতিবাদ করত, আবার কাউকে কষ্টও দিত না। সবাইকে সম্মান করত, ছোটদের স্নেহ করত।
আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে আর ফেরা হয়নি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনে বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও উলামায়ে কেরামও অংশ নেন। তাদের সঙ্গেই যোগ দেন সিফাতুল্লাহ।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট কারফিউ চলাকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকায় একটি মিছিলে অংশ নেন তিনি। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সিফাতুল্লাহ।
সন্ধ্যার পর পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর পৌঁছালে পুরো বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরদিন ৬ আগস্ট গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে অসংখ্য মানুষ, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়।
পরিবার জানায়, সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত এখনো তাদের চোখের সামনে ভাসে। বাড়ির কেউ আজও সেই স্মৃতি ভুলতে পারেননি।
সিফাতুল্লাহর চাচা কাঞ্চন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘সিফাতুল্লাহ খুবই ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী ছেলে ছিল। বাড়িতে এলেই আমার ঘরে এসে বারান্দায় শুয়ে থাকত। মজা করে বলত—বড় মা, আমাকে ডাকবেন না, খাওয়ার সময় হলে ডাকবেন। সেই কথাগুলো আজও কানে বাজে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো প্রায় প্রতিদিন ওর কথা বলি। পরিবারের সবাই ওকে খুব বেশি মিস করে। এমন ভালো ছেলে আমাদের পরিবারে খুব কমই হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের সঙ্গে আপস করত না। সত্য কথা বলতে ভয় পেত না।’
চাচার ভাষায়, ‘ওর বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় আলেম হবে। সমাজের মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে গেল।’
ছোট ভাই মোহাম্মদ হিজবুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বড় হয়েছি। একসঙ্গে মাদ্রাসায় যেতাম, একসঙ্গে খেলতাম, একসঙ্গে বাড়ি ফিরতাম। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় ভর্তি হওয়ার পরই প্রথম আমরা আলাদা হয়েছিলাম। এর আগে কখনো ভাইকে ছাড়া থাকিনি।’
তিনি বলেন, ‘ভাই মোটরসাইকেল চালানো শিখতে খুব আগ্রহী ছিল। প্রায়ই বলত, ভাই আমাকে মোটরসাইকেল চালানো শেখাও। আমি ভয় পেতাম, যদি পড়ে গিয়ে আঘাত পায়। এখন সেই কথাগুলো মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। অনেককে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। আমরা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিল। আমি কোনো ভুল কথা বললেও আমাকে সংশোধন করত। এলাকার প্রভাবশালী কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধেও কথা বলতে দ্বিধা করত না।’
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মাগরিবের পর খবর পাই আমার ছেলে আর নেই। সেই মুহূর্তের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পরদিন গ্রামের মানুষের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করি।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিল, যেখানে বৈষম্য থাকবে না, মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে, অন্যায়ের বিচার হবে। কিন্তু এত সময় পার হয়ে গেলেও সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না।’
বিচারই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা
নূরুজ্জামান জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, মাসিক ভাতা এবং অন্যান্য সরকারি সহায়তা তারা পেয়েছেন।
তবে তিনি বলেন, ‘এসব সহায়তা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন সন্তানের শূন্যতা কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন।’
তার ভাষায়, ‘শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হবে যদি বিচার নিশ্চিত হয়।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন মামলার তদন্তে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
নূরুজ্জামান অভিযোগ করেন, জমি নিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এ কারণে তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সিফাতুল্লাহর নামে একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
স্মৃতিতে আজও জীবন্ত সিফাতুল্লাহ
মুনিয়ারীকান্দার বাড়িটিতে গেলে মনে হয়, সময় যেন ২০২৪ সালের সেই আগস্ট মাসেই থেমে আছে। তার ব্যবহৃত বই, পোশাক, খাতা, কোরআন শরিফ—সবকিছুই আগের মতো সংরক্ষণ করে রেখেছে পরিবার।
প্রতিদিন সকালে বাবা কবর জিয়ারত করেন। মা ছেলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র পরিষ্কার করেন। ছোট ভাই এখনও বিভিন্ন কাজের সময় অজান্তেই ভাইকে খুঁজে ফেরেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষায়, সিফাতুল্লাহ শুধু একজন সন্তান, ভাই কিংবা শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্বপ্ন, একটি আদর্শ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
আজও প্রতিটি সকাল শুরু হয় তাকে স্মরণ করে, প্রতিটি রাত শেষ হয় তার জন্য দোয়া করে। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবার অপেক্ষা করছে—কবে তার হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে, কবে বাস্তবায়িত হবে জুলাই সনদ, আর কবে তারা অন্তত এই বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারবে যে তাদের সন্তানের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদ সিফাতুল্লাহর পরিবারের জন্য সরকার থেকে সময়ে সময় যে সহযোগিতা বরাদ্দ হয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সেগুলো যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গত তিন-চার দিন আগেও আমি সরেজমিনে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে জমি-সংক্রান্ত একটি বিরোধের বিষয়টি জানতে পেরে তা সমাধানের চেষ্টা করেছি। যদিও এখনো পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘সরকার থেকে শহীদ পরিবারের জন্য যখনই কোনো নির্দেশনা বা সুযোগ-সুবিধা এসেছে, উপজেলা প্রশাসন তা শতভাগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
কেকে/ এমএস