প্রতি বছর বর্ষা এলেই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। দেশের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলেই শুরু হয় মাইকিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান। কিন্তু স্থায়ী পুনর্বাসন বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রতি বছরই এই মৌসুমে প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটে। সারা বছরই অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, নতুন ঘর বানিয়ে রমরমা ব্যবসা চললেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
নামমাত্র অভিযান চালিয়ে কিছু চুনোপুঁটি ধরলেও রাঘব-বোয়াল থেকে যায় আড়ালে। আর বর্ষা এলেই শুরু হয় পাহাড়ধস। আবার বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ে অবৈধ বসতি ও দখলের চাপ বেড়ে যায়। ফলে পাহাড়ধস শুরু হলে জীবন দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই বর্ষার শুরুতেই পাহাড়ধসে মাত্র চার দিনে ৩০ জনের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। এতগুলো প্রাণ হারানোর পর কর্তৃপক্ষের হুঁশ ফিরল। এখন বাসিন্দাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে বলে সংসদে আলোচনা হলো। এদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ৪ দিনে পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এ তথ্য জানান তিনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী জানান, মুষলধারে বৃষ্টি ও সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ৫ জন, কক্সবাজারে ১৯ জন, রাঙামাটিতে ১ জন এবং বান্দরবানে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল:
চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা স্বাক্ষরিত এক বিশেষ অফিস আদেশে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বেগবান করতে ১০ ও ১১ জুলাই (শুক্রবার ও শনিবার) সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
কক্সবাজারে হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন ৫০ হাজার পর্যটক:
টানা চার দিনের বৈরী আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ ও উত্তাল সাগরের প্রভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। গত চার দিনে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক তাদের হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন। এ অবস্থায় লোকসানে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচ শতাধিক হোটেলের প্রায় অর্ধেক কক্ষ খালি পড়ে আছে। সমুদ্রসৈকতেও পর্যটকের উপস্থিতি কম। সৈকতসংলগ্ন কয়েকশ দোকানপাট ও পর্যটননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাত্র চার দিনেই কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আটকা পড়া পর্যটকদের সরিয়ে আনছে সেনাবাহিনী:
রাঙামাটির সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের মধ্যে দেড়শ জনকে সরিয়ে আনা হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পর্যটকদের নিয়ে আসার কার্যক্রম শুরু করে বাঘাইহাট সেনা জোন। সাজেক থেকে বাঘাইহাট পর্যন্ত তিন জায়গায় পানি ওঠার কারণে সাজেকের সঙ্গে যান চলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে আটকা পড়ে সাড়ে পাঁচ শতাধিক পর্যটক। বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর স্কট দিয়ে পর্যটকদের সাজেক থেকে বাঘাইহাট পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়। মাচালং, সীমানাছড়া ও বাঘাইহাট বাজারে পানি ওঠার কারণে পর্যটকরা সাজেকে আটকা পড়ে। সেনাবাহিনী মোটরবাইক, সিএনজি অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রার সাহায্যে পর্যটকদের সাজেক থেকে নিয়ে আসে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, সাজেকে আটকা পড়া ৫৬১ জন পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর স্কটের মাধ্যমে ১৫০ জনকে সরিয়ে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাকি পর্যটকদেরও সরিয়ে আনা হবে বলে তিনি জানান।
চকরিয়ায় দুই ভাই-বোনের মৃত্যু:
চার দিনের টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোররাতে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোহছেনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত দুজনই সম্পর্কে আপন চাচাতো ভাই-বোন। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছালেকুজ্জামান বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পাহাড়ধসে লামায় ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু:
বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নে ভারী বর্ষণের জেরে ভয়াবহ পাহাড়ধসে দুটি পরিবারের শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জন এবং অন্য পরিবারের ২ জনসহ মোট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আজিজনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন জানান, দুই পরিবারের শিশুসহ ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকার মহিলা ইউপি সদস্যসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
খাগড়াছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত:
খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সহস্রাধিক পরিবার জলাবদ্ধতা ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ ছড়া-খালের পানি কিছুটা নেমেছে। মেরুন এলাকায় পানি অপরিবর্তিত রয়েছে।
জেলা সদরের কিছু নিচু স্থানে জলাবদ্ধতার উন্নতি হলেও বেতছড়ি মার্মাপাড়া, বিচিতলা, লার্মাপাড়া, বটতলার আংশিক এলাকায় এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পাহাড়ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
লোহাগাড়ায় ফায়ার সার্ভিসের অনন্য দৃষ্টান্ত:
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়া এক গর্ভবতী নারীকে কাঁধে করে উদ্ধার করে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। সকাল ৭টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম আমিরাবাদ খৈয়ারকুল এলাকায় বন্যার পানি থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এই সাহসিকতা ও মানবিক কাজের বিষয়ে লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিসের টিম লিডার জাহাঙ্গীর আলম জানান, লোহাগাড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাদা মিনহাজ আমাদের কাছে পানিবন্দি ওই গর্ভবতী নারীর খবরটি পৌঁছে দেন। খবর পেয়ে আমরা কালক্ষেপণ করিনি। আমাদের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে বন্যাকবলিত স্থান থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করে সুস্থ ও নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়।
কমলগঞ্জ ও রাজনগরে পানিবন্দি ১৫ হাজার মানুষ:
টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের দুটি স্থানে এবং রাজনগর উপজেলায় উজিরপুর এলাকায় বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় দুই উপজেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গঙ্গানগর এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়। ফলে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুরসহ অন্তত ৫টি গ্রামে এবং কমলগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামসহ পুরো উপজেলায় প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যায় তলিয়ে গেছে আউশ ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে এবং পানিবন্দি মানুষের মধ্যে দ্রুত ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিকে ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাঙামাটিতে আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড় বাড়ছে:
রাঙামাটিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে লোকসংখ্যাও বাড়ছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে কাচালং নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। এতে ৩০ গ্রামের হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কাপ্তাইয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বিজিবি জোনের পক্ষ থেকে খাবার বিতরণ করেছেন জোন কমান্ডার লে. কর্নেল কাওসার মেহেদী। রাঙামাটির বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী ও রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান।
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ:
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের রামু উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। উপজেলার ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালাসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের লাখো মানুষ এখন সম্পূর্ণ পানিবন্দি। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বন্যাকবলিত পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের প্রধান সড়ক ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে জেলা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান জানান, দুর্ভোগে পড়া মানুষকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
কেকে/এলএ