ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো কূটনৈতিক ঘাটতি রাখছে না। তবে তাকে ফেরানোর জন্য কোনো ‘শর্ট’ বা সহজ প্রক্রিয়া নেই। দুই দেশের মধ্যকার আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক জটিলতার কারণে কূটনৈতিকভাবে তাকে ফেরত আনা বেশ সময়সাপেক্ষ ও কঠিন। বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ঘাটতি নেই। প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সময় লাগে।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি বা অন্য কোনো প্রযোজ্য আইনি কাঠামোর আওতায় দণ্ডিত কোনো ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়।
সম্প্রতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বলছেন এবং সময়ের উল্লেখ করেছেন। তাহলে তাকে ফেরাতে বাধা কোথায়—এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশের আদালত একজনকে সাজা দিয়েছেন। সাজাপ্রাপ্ত আসামি যিনি বাংলাদেশে অনেক অন্যায়, অত্যাচার ও কুকর্ম করে বিদেশে পালিয়ে আছেন। শেখ হাসিনা কী বলছেন, না বলছেন, সেটা প্রাসঙ্গিক না।’ শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের সহযোগিতা না আইনি জটিলতা আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আইনি জটিলতা আছে কি নাই, সেটা আইন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুঁটিয়ে দেখবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সঠিক চ্যানেলে চেষ্টা করছি। বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আসামিকে যখন ফেরত আনা হয় বা যে প্রটোকল বা নর্মস (মানদণ্ড) আছে, সেটা অনুযায়ী ওনাকে এখানে এনে বিচার করা হবে।’
আইনি ও বিচারিক জটিলতা : শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ও আইনি চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে তাকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে ভারত বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তা পর্যালোচনা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। ভারত সরকারও জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি অভ্যন্তরীণ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করছে।
আইনি চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে হত্যা, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তাকে বিচারের আওতায় আনতে এই আইনি পথগুলো পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। তবে একজন বাংলাদেশি হিসেবে তার দেশে ফেরার সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও, দেশে পৌঁছামাত্রই তাকে আদালতের ওয়ারেন্ট ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনার ফিরে আসা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। ফলে তার বাংলাদেশে আসায় বাধা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমি মনে করি, তার দেশে আসতে বাধা আছে। বাধাটা হলো পাসপোর্ট। উনি যখন গেছেন, তখন ওনার কাছে রেড পাসপোর্ট ছিল। ধরে নিই, উনি সেটা নিয়ে গেছেন। কিন্তু সরকার তো সেই রেড পাসপোর্ট পরবর্তীকালে বাতিল করে দিয়েছে। তো ওনার কাছে এখন কোনো বৈধ (ভ্যালিড) পাসপোর্ট নেই।’ অতীতের উদাহরণ তুলে ধরে মনজিল মোরসেদ বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনার আমলে ভারত থেকে ফেরার জন্য সে সময় ট্রাভেল পাস চেয়েও পাননি।
‘ওনার তো এখন বৈধ (ভ্যালিড) পাসপোর্ট নেই। তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাধা হলো এটি।’
এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আরও কঠিন হয়ে গেল শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড মামলায় তাকে প্রধান আসামি করায়। হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ২৮ থেকে ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, বর্তমানে তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়া চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে। বুধবার (৮ জুলাই) নিজ কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তকারী সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র, নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তদন্ত শেষ করেছে। এখন কেবল আইনি ও কারিগরি যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অপেক্ষা।
আ. লীগে নেতৃত্বে সমন্বয়ের অভাব : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ভারতীয় একটি গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে এ বছরই তার বাংলাদেশে ফেরার খবর দেওয়ার পরই এ বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে চর্চিত হয়। চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। মামলায় পলাতক হিসেবে তার বিচার করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এ ইমেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ‘শিগগিরই’ নিজ দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।
তবে তিনি সহসাই দেশে ফিরতে পারবেন কি না—এ প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে বর্তমানে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত রাজনৈতিক অবস্থান বদল বা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থানেই অনড় রয়েছে। নেতৃত্বে বড় কোনো পরিবর্তন আনা কিংবা কৌশলগত দিক বদল করার মতো পদক্ষেপ বা সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। দলের এমন সাংগঠনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে দেশে ফেরা শেখ হাসিনার জন্য কঠিন।
তৃণমূল সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা সমন্বিত রূপরেখা না থাকায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা অনেকটাই বিভ্রান্ত। শীর্ষ পর্যায়ে শূন্যতার কারণে বিভিন্ন স্থানীয় পর্যায়ে তৃণমূল নেতারা ভিন্ন কোনো পথে হাঁটার চেষ্টাও করছেন।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ও রাজনীতি নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি ও ভুল স্বীকার করতে হবে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি তাদের মেনে নিয়ে এর মুখোমুখি হতে হবে।
কেকে/এলএ