চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। এরপর শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে অথবা বিদেশে পালিয়ে যান। অনেকে গ্রেপ্তার হন। দলটির প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বন্ধ হয়ে যায় দলীয় কার্যালয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। তারপরও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঝটিকা মিছিল, সমাবেশ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নেতাকর্মীরা। তাতেও রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করতে পারছেন না তারা। তবে দলকে সক্রিয় করতে ও নেতাকর্মীদের মনোবল ফেরাতে দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন রাজনৈতিক কৌশল বা ‘নতুন চাল’ গ্রহণ করেছেন।
শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই তা যেন নিজের মাটিতেই হয়।”
এদিকে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়টি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা। এ ছাড়া শেখ হাসিনার জন্য ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসায় বাধা দেখলেও, আইনগত কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা : সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে জোর আলোচনা সামনে এসেছে। তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে দাবি করেছেন। তারা আত্মসমর্পণের কথা ভাবছেন বলেও রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে টেলিফোনে শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকার দেন বলেও রয়টার্স জানিয়েছে।
দিল্লিতে থাকা শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে, এবং তাদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
প্রসঙ্গত, চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপরও বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি আছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় আছে। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় নানা অভিযোগ এবং দুর্নীতির অভিযোগেও বিপুল সংখ্যক মামলা আছে।
শেখ হাসিনা টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরতে চান। তারা আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করতে চান। বাংলাদেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের সরকার তাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই ফিরে যাব।”
আ.লীগকে সক্রিয় করার চাল : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বিএনপি সরকারও সেটাই বহাল রেখেছে জাতীয় সংসদে অধ্যাদেশ অনুমোদন করার মাধ্যমে। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। দল ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে তিনি বিদেশে বসে প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্সকে জানান।
তিনি বলেন, “তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সিদ্ধান্ত জনগণই নিক।”
দেশে ফেরার প্রশ্নে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়টি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না, বা তারা কী করবেন, সেটা তাদের বিষয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তাদের বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে বিএনপি সরকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে উনি (শেখ হাসিনা) যে হত্যার মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন, শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করেছেন। সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত হোক, সেটা জনগণ চায়। আদালতে বিচার চলছে। ফলে অপরাধের ব্যাপারে বিচার হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।”
এদিকে, শেখ হাসিনার জন্য ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। গতকাল রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই মন্তব্য করেন তিনি। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, দিল্লি থেকে তাকে যতটুকু পারমিট করা হয়, সে অনুযায়ী তিনি কথা বলেন। ফলে শেখ হাসিনা আসবেন কি আসবেন না, কীভাবে আসবেন, বিচার হবে কি না—এসব মূলত দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ এখন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়।
শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে সাংবাদিকদের বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তবে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার চলাচলের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই; কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে তার কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “একজন ফিউজিটিভের পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই আত্মসমর্পণ করতে হবে।”
কেকে/এলএ