শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: চড়া দামে দিশেহারা ক্রেতা      ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ংকর পরিকল্পনা      লটারির মাধ্যমে ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে বদলি      কল ড্রপ কমানোর আহ্বান টেলি যোগাযোগ মন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু      ৮৬ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১৭৯ সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ      ঢাকায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর      
খোলাকাগজ স্পেশাল
চড়া দামে দিশেহারা ক্রেতা
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২০ এএম আপডেট: ৩১.০৭.২০২৬ ১০:২৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে যেন ফের অস্বস্তির আগুন। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। হাত বাড়ালেই ছ্যাঁকা খাচ্ছে পকেট; চাল-ডাল থেকে শুরু করে শাকসবজিÑ কোনো কিছুরই দামই আর ক্রেতার নাগালে নেই। এর ওপর মৌসুমী প্রতিকূলতা ও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে কাঁচা মরিচ ও সবজির দাম। প্রতিটি বাজারে ক্রেতাদের দীর্ঘশ্বাস আর ক্ষোভের চিত্র এখন পরিচিত দৃশ্য। সীমিত আয়ের মানুষগুলো বাজারের থলে ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন, আর উচ্চমূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী বাজারে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন মধ্য ও নিম্নবিত্তরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এমন চিত্র চোখে পরে। জানা যায়, শুধু পেঁপে ৪০ টাকা, দুই-একটি সবজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বাকি সব সবজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে। 

বাজারে প্রতি কেজি কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, বরবটি প্রতি কেজি ১২০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ১০০ টাকা, গাজর প্রতি কেজি ১৩০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ১৪০-১৬০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বেগুন (লম্বা) প্রতি কেজি ১২০ টাকা, গোল বেগুন প্রতি কেজি ১৬০ টাকা ও কাঁকরোল প্রতি কেজি ১২০ টাকা ও টমেটো প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা প্রতি কেজি।, অনেক জায়গায় আবার এর  থেকেও বেশি বিক্রি হতেও দেখা গেছে।

ডিম-মুরগির দাম চড়া: বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগে ১৩৫ টাকা ছিল। আর দেড় থেকে দুই সপ্তাহ আগে ১২০ টাকাতে পাওয়া যেত। এছাড়া ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগির কেজি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। 

চড়া মাছের দামও: বাজারে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হতো কিছুদিন আগেও। সেগুলো এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত কেজি হাঁকছেন বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের দাবি, টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মাছের সরবরাহে। শুধু রুই নয়, একই অবস্থা তেলাপিয়া-পাঙ্গাস থেকে শুরু করে প্রায় সব মাছেরই। সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এসব মাছের দাম বেড়েছে।  

তেলাপিয়া ও পাঙাশের দামও বেড়েছে কেজিতে ২০-৩০ টাকা। প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ির কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেশি। পাবদা মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। অন্যদিকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় এক কেজির ইলিশের জন্য গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। 
নিউমার্কেটের মাছ বিক্রেতা মো. রাজেন মিয়া বলেন, টানা বৃষ্টি আর বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে মোকাম থেকে আগের মতো মাছ আসছে না। যেসব মাছ আসছে, সেগুলোর পাইকারি দামই অনেক বেড়ে গেছে। 

মিরপুরের কাজিপাড়া বাজার করতে এসেছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ইমন সাহা। তিনি বলেন, গত কিছুদিন ধরেই সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে। তবে গতকাল দাম আরও বেড়েছে। বলতে গেলে বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। বেশিরভাগ সবজি ১০০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচ কিনলাম ৩৮০ টাকা কেজি, অনেক জায়গায় আবার ৪০০ টাকা। এত দাম দিয়ে সবজি কিনে খাওয়া কি সম্ভব? বর্ষায় বৃষ্টির কারণে সবজির দাম বাড়তে পারে। তাই বলে এতটা বাড়বে আর বাজারে কোনো মনিটরিং হবে না, সেটা কীভাবে হয়? বিক্রেতারা যে যার মতো করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। কোনটার কত বাড়বে, সেটা দেখার মনে হয় কেউ নেই। 

একই রকম অভিযোগ জানিয়ে বনানী কাঁচাবাজাওে বাজার করতে আসা ক্রেতা রায়হান মোল্লা বলেন, ‘গত কিছুদিন তা-ও ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে সবজিগুলো ছিল। আজকের বাজারে বেশিরভাগ সবজি ১০০ থেকে ১৬০ টাকা। সবজিই যদি এত বেশি দামে কিনে খেতে হয়, তাহলে মাছ, মাংস আর মুরগি কীভাবে কিনব? সেগুলোর তো আরও বেশি দাম।’ 
চট্টগ্রামেও লাগামছাড়া সবজির দাম: মাছ-মাংসের দাম নাগালের বাইরে যাওয়ার পর নিম্ন ও মধ্যবিত্তের শেষ ভরসা ছিল সবজি। টানা বর্ষণের মধ্যে সেই ভরসাটুকুও ডুবতে বসেছে। চট্টগ্রামের বাজারে বেশ কয়েকটি সবজির কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। আর কাঁচামরিচের দাম উঠেছে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকায়। 

গতকাল চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউরী, বহদ্দারহাট কাঁচা বাজার, পতেঙ্গা বাজার, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, কালা মিয়া বাজার, মোহরা কামাল বাজার, বেড়া মার্কেট কাঁচা  বাজারসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, মান ও বাজারভেদে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। লম্বা বেগুনের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। করলা, বরবটি ও কাঁকরোলের কেজি কিনতে লাগছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা। কচুর লতির দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকা। ধুন্দুল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পটোল ও ঢ্যাঁড়শ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। আকারভেদে একটি লাউয়ের দাম ৭০ থেকে ৯০ টাকা। 

এই চড়া বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে শুধু পেঁপে। প্রতি কেজি পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। তবে সপ্তাহ দুয়েক আগেও অধিকাংশ সবজির দাম বর্তমানের তুলনায় ২০ থেকে ৪০ টাকা কম ছিল। সবচেয়ে বেশি অস্থির কাঁচামরিচের বাজার। খুচরায় ২৫০ গ্রাম মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজি ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা। কাজীর দেউরী বাজারে একসঙ্গে এক কেজি কিনলে কিছুটা কমে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সপ্তাহ দুয়েক আগেও এর দাম ছিল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা। 

বেড়েছে ডিমের দামও। ফার্মের সাদা ডিমের ডজন ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং বাদামি ডিম ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা। 
ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতের সবজি নষ্ট হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় ফসল তোলা যাচ্ছে না এবং চট্টগ্রাম নগরে সরবরাহও কমেছে। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। ক্রেতারা অবশ্য বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ কমতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগে অস্বাভাবিক মুনাফা করা হচ্ছে কি না, সেটিও দেখা দরকার। 

এক মাসে চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা: মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নওগাঁর বাজারে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত মাসে যে চাল ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। অন্যদিকে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চালের দাম পৌঁছেছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। অস্বাভাবিক এ মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা।

গতকাল নওগাঁ পৌর এলাকার খুচরা ও পাইকারি চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, শুধু এক সপ্তাহেই আতপ চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। মাসের হিসাবে এই বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। বর্তমানে মানভেদে খোলা বাজারে চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। একই সময়ে প্যাকেটজাত চালের দামও বেড়ে ২০০ থেকে ২১০ টাকায় পৌঁছেছে। 

শুধু চিনিগুঁড়া নয়, কাটারি ও জিরাশাইলসহ অন্যান্য চিকন চালের দামও বেড়েছে। বর্তমানে এসব চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকায়। তবে মোটা স্বর্ণা-৫ চালের বাজারে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন হয়নি। 

অদৃশ্য খরচই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে: উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে থাকা অদৃশ্য ব্যয়ই দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, কৃষিপণ্যসহ কয়েকটি খাতে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অদৃশ্য খরচ রয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। 

গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের যন্ত্রণা। এর প্রভাব থেকে কেউ পুরোপুরি মুক্ত নয়। তবে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় নানা ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়। 

তিনি বলেন, দেশের কৃষকদের কাছে সঠিক বাজার তথ্য না থাকায় অনেক সময় চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন হয়। আবার কোনো কোনো সময় উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়। ফলে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পান না, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  চড়া দাম  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close