বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: শাপলা চত্বর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী      চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গেপ্তার      শিল্পখাতে গ্যাস সংকট সমাধানের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর      সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকলে গ্রেপ্তার নয়, হাইকোর্টের এমন আদেশ স্থগিত      মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সক্রিয় সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী      নিরাপদ খাদ্য কার হাতে      ইয়াবার ভয়াবহ থাবায় বাংলাদেশের তরুণরা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নৌপথ অকার্যকরে বছরে ক্ষতি ৭০০ কোটি টাকা
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ৯:১৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের নদী-খাল ও নৌপথের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ দখল, পলি জমা, নাব্য সংকট, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সড়কপথের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। রাজধানীর বৃত্তাকার নৌপথ কার্যকর না থাকায় যানজটের ক্ষতি যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যয়বহুল সড়ক পরিবহনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহনে বিলম্ব, নদী-খালের অস্তিত্ব সংকট এবং নৌপথের ক্রমাবনতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খাল পুনঃখনন, নৌপথের নাব্য ফিরিয়ে আনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং বৃত্তাকার নৌপথকে কার্যকর করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্য, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা সম্ভব হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথ কার্যকরভাবে পরিচালিত না হওয়া এবং রাজধানীর তীব্র যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষতি হচ্ছে। 

বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ পণ্য সড়কপথে পরিবহন করা হয়, যদিও নৌপথ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। যেখানে সড়কপথে এক টন পণ্য পরিবহনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে নৌপথে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে খরচ হয় মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। ফলে নৌপথের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় বাণিজ্যিক পরিবহন খাতে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গতকাল বুধবার ডিসিসিআই আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। 

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত ও দ্রুত নৌ-যোগাযোগের অভাবে কৃষি খাতও ক্ষতির মুখে পড়ছে। ফসল কাটার পর কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারজাত করা সম্ভব না হওয়ায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য নষ্ট হচ্ছে বা কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জলপথ আরও কার্যকর ও সচল করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তথ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক খাল নেটওয়ার্কের ৫৫ শতাংশের বেশি বর্তমানে পলি ভরাট অথবা অবৈধ দখলের কবলে। সরকারি রেকর্ডে অনেক খালের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। একইসঙ্গে দেশের প্রায় ৫২০টি নদী বিলুপ্তপ্রায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। চার শতাব্দী পুরোনো নদীমাতৃক ঢাকার অসংখ্য প্রাকৃতিক জলপথও ইতোমধ্যে কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছে। জলপথের নাব্যও দ্রুত কমে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে যেখানে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ চলাচলের উপযোগী থাকে, সেখানে শুকনো মৌসুমে তা নেমে আসে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৫ কিলোমিটারে। দূষণ, দখল ও মৌসুমি সংকটের কারণে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে, ফলে নৌপথ সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের জলপথের টেকসই উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি কর্মদক্ষতাভিত্তিক ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সমন্বয় করে জাতীয় লজিস্টিকস নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সমন্বিত জলপথ ও বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন। নৌ-লজিস্টিকস, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর পিপিপি কাঠামো গড়ে তোলা, নদী-খালের সীমানা রক্ষায় স্যাটেলাইট, জিআইএস ও জিপিএসভিত্তিক ডিজিটাল নজরদারি চালু করা এবং খালসংযোগস্থলে কোল্ড চেইন ও কৃষি-লজিস্টিক হাব স্থাপন করতে হবে। 

তাদের মতে, খাল পুনঃখননের সঙ্গে জলাভূমি সংরক্ষণ ও ইকো-ট্যুরিজমকে যুক্ত করে সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলা, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্সভিত্তিক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে ড্রেজার, ভারী যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জলপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকার ১১২ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথ কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। অতীতে পর্যাপ্ত ফিডার সার্ভিস ও স্থলপথের সংযোগ না থাকায় ওয়াটার বাস ও স্পিডবোট সেবাও টেকসই হয়নি। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ঘাটতিও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। 

পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, রাজধানীর ঢাকার চারপাশের খালগুলোর আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের রক্তনালির মতো। যদিও দখল ও দূষণেল ফলে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, তবে এ কর্মসূচির সুফল পেতে সারা দেশের খালগুলোর মধ্যকার আন্তঃসংযুক্ত একান্ত অপরিহার্য।  

তিনি বলেন, খাল ও নদী খনন কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিল্পের বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে সেদিকে সবাইকেই সজাগ থাকতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিল্প-কারখানায় যেন স্বল্প খরচে ইটিপি স্থাপন করা যায় সে বিষয়ে প্রযুক্তি সহায়তার প্রদানের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। 

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের ১৪১৫টির বেশি নদীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিত দখল এবং পলি জমার কারণে এই নদী ও খালগুলোর কার্যকারিতা হারিয়েছে। 

তিনি বলেন, নদী পথের পিছিয়ে পড়ার কারণে দেশের ৭৭ শতাংশ পণ্য পরিবহন সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বর্তমান সরকারের সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির উদ্যোগ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আরও প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হবে।
 
তিনি আরও জানান, রাজধানীর চারপাশের ৪টি নদীর ১১২ কিলোমিটার নৌপথকে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আদলে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। যার মাধ্যমে যানজট নিরসন ও নদীভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলতে সম্ভব হবে। নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুবিধা কাজে লাগাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানো এবং এখাতের বিনিয়োগে বেসরকারি খাতকে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং নাব্য বাড়াতে ড্রেজিং কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, খাল খনন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা, নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়াতে কার্যকর সাপ্লাইচেইন ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন এবং নদীর সংলগ্ন এলাকায় এগ্রোভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। 

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নদীতে পানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করে নিচু কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং খাল খননের ক্ষেত্রে পানির প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

তিনি জানান, সরকারের প্রায় ১৫টি সংস্থা নদীর সঙ্গে জড়িত থাকলেও এককভাবে কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না, এমতাবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়, দায়বদ্ধতার পাশাপাশি একটি একক অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  নৌপথ অকার্যকর   বছরে ক্ষতি   অবৈধ দখল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close