রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। তারপর থেকে সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ফ্যাসিবাদ নির্মূলের নামে বিরোধী পক্ষের ওপর হামলা চালানো, সাংবাদিকদের হুমকিসহ রাকসু নেতাদের বেপরোয়া আচরণ বেড়েই চলছে।
সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধরের ঘটনা ঘটেছে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে। প্রক্টর, শিক্ষক ও পুলিশের উপস্থিতিতে পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের এ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রাকসু ও শিবির নেতারা ক্যাম্পাসে এতটাই ভয়ের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে ভয় পায়।
গত সোমবার এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে তিন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে ঢুকে তাদের মারধর করেন রাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। পরে আহত এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়েও মারধর করা হয়। এমন কর্মকাণ্ডকে ‘মব সন্ত্রাস’ অ্যাখ্যা দিয়ে ঘটনাটির তদন্ত সাপেক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ও ভেতরে মারধরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারধরে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ শিবিরের কয়েকজন নেতা সরাসরি অংশ নেন। কয়েকটি ভিডিওতে তাদের আচরণ ছিল আক্রমণাত্মক।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে বেলচা নিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকতে চাইছেন আম্মার। সহযোগীরা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। এ সময় আনাস নামের এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে আম্মার বলেন, ‘তোরে একবারে পুঁইতা ফেলাব কিন্তু, একবারে পুঁতে ফেলব।’
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পাঠকক্ষের ভেতরে একটি বড় লাঠি দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে পেটাচ্ছেন আম্মার। সেখানে শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
আরেকটি ভিডিওতে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির, শিবিরের মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব এবং শিবিরপন্থি হিসেবে পরিচিত রমজান আলীকে এক শিক্ষার্থীকে ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারতে দেখা যায়। একপর্যায়ে রমজান আলী চেয়ার তুলে আঘাত করতে উদ্যত হলে প্রক্টরসহ উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে থামান।
মারধরের বিষয়ে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, তারা প্রক্টরের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে পুলিশের কাছে দেওয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে তাকে প্রশাসন ভবনের সামনে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাকসু ভবনে তাদের ওপর হামলা হয়।
প্রশাসনের উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির চরম অবমাননা বলে মন্তব্য করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন। তিনি বলেন, প্রশাসনের উপস্থিতিতে গ্রন্থাগারে ঢুকে এভাবে মারধর করেছে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দাবিকারী রাকসু ও শিবির। এটি ভীষণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির অবমাননা। এ হামলার চেয়ে জঘন্য ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার হুমকি রাকসু ভিপির :
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় ‘রাকসু ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে’ সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলেছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ‘হুমকি দিয়েছেন’।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন। এ সময় তার পাশে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ছিলেন। মোস্তাকুর রহমান জাহিদের দাবি, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘একপাক্ষিকভাবে’ প্রচার করেছে এবং ‘ছাত্রলীগের পক্ষে’ উপস্থাপন করেছে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা সংবাদে যেসব শব্দ ব্যবহার করছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। গতকাল অনেকেই এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন, যাতে ছাত্রলীগকে ডিফেন্ড করা হয়েছে। এখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে যারা এ ধরনের সংবাদ করেছেন, আমরা সেগুলো সংগ্রহ করছি এবং তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করছে শিবির :
সালাহউদ্দিন আম্মার ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘এখতিয়ারবহির্ভূত তৎপরতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ তুলে বিচারের দাবি করেছেন শিক্ষক নেটওয়ার্ক। গতকাল বুধবার উপাচার্য বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তারা গত ২৭ জুলাই সংঘটিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্যাম্পাসে আইনের শাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তারা জানান, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিচার করা ‘জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক চেতনার’ পরিপন্থি। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
আবেদনের শেষাংশে তারা বলেন, অতীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের, কোনো ছাত্রসংগঠন বা রাকসুর নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নষ্ট করতেই হামলা :
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেছেন, লাইব্রেরির মতো একটি নিরাপদ স্থান, যেখানে জ্ঞানচর্চা হয়, সেই জ্ঞানচর্চার পরিবেশে হামলা চালিয়েছে জঙ্গি শিবিরের নেতাকর্মীরা। শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের নাম দিয়ে মব সৃষ্টি করে তাদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই শিক্ষার্থীদের হত্যা করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করা। তিনি আরও বলেন, যারা সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
কেকে/ এমএস