মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর ভাঙনে সৃষ্ট বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আক্রান্ত এলাকার মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। বিশেষ করে বন্যাকবলিত রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলার রোপা আমন আবাদকৃত কৃষকদের দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। পানি যত নামছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষত। বন্যায় রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও বানের পানিতে ফসলি জমি, বীজতলা ও সবজি খেত ভেসে গেছে।
বন্যাকবলিত অনেক পরিবারে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। বিশেষ করে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, সর্দি-জ্বর ও এলার্জি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেনসকল বয়সী মানুষেরা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় কবলিত রাজনগর উপজেলায় ৬০ হেক্টর রোপা আমনও কমলগঞ্জ উপজেলায় ৮৩ হেক্টর বীজতল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, রাজনগর, কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় বস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। সবজি, ধান, পানের বরজ, পেঁপে বাগান ও মাছের পুকুর মিলিয়ে শতাধিক কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল হারিয়ে তারা এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
সরেজমিনে রাজনগর এলাকায় দেখা যায়, শতাধিক কৃষকের ফসলি জমি, সবজি ক্ষেত, মাছের পুকুর ও বিভিন্ন কৃষি খামার তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বছরের সঞ্চয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে পথে বসার আশঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকদের।
কৃষকরা বলছেন, বানের পানিতে সম্পদ নয়, ভেসে গেছে তদের স্বপ্ন।
রাজনগর উপজেলার সৈয়দনগর এলাকার কৃষক মাসুদ মিয়া বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার জমির বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কিভাবে রোপা আমন জমি আবাদ করব এই নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছি।;
বর্গাচাষী আজাদ মিয়া বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সব মূলধন বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন সব শেষ, বাঁচার আর কোনো পথ দেখি না। কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।’
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষক লিয়াকত জানান, বন্যার পানিতে আমাদের বীজতলা ও শাক সবজির জমি নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা আমাদের জন্য অনেক কষ্টদায়ক।
কৃষক মানিক মিয়া জানান, আমি পরের জমিতে বর্গা চাষ করে ধান আবাদ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করি। এ বছর বন্যার পানিতে আমার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কিভাবে জমি আবাদ করি। এই নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় রয়েছি। জমি আবাদ করতে না পারলে না খেয়ে দিন কাটাতে হবে।
জেলার বন্যা কবলিত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনে কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলা সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েন। আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে শনিবার (১১ জুলাই) থেকে পানি কমতে শুরু হলে বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগের দেখা দেয়। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটের কারণে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, সর্দি-জ্বর ও এলার্জি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষেরা।
রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের বন্যায় আক্রান্ত জুয়েল মিয়া, মতিন, ছাদিক মিয়া বলেন, ‘দুই দিন পানির নিচে থাকার পর গতকাল রাতে পানি কমেছে। তবে পানি কমার পর নতুন করে রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষেরা। আমাদের পরিবারের কারো জ্বর উঠেছে আবার কারো ডায়েরিয়া হচ্ছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, সম্প্রতি বন্যায় কৃষকের বীজতলা নষ্ট হয়েছে বেশি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও পুরো তথ্য সংগ্রহ চলমান। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষতি নিরূপন করে প্রতিবেদন আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। একই সাথে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ করা আছে। যাতে সবাই পানিবাহিত রোগোর চিকিৎসা নিতে পারেন।;
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘বন্যার্তদের জন্য ইতোমধ্যে খাবার, চাল ও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়ছে। বন্যাকবলিত প্রতিটি এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।’
কেকে/এমএ