আষাঢ়ের শেষ প্রহরে যে বৃষ্টি নেমেছে, তা যেন রাজধানীবাসীর জন্য নতুন করে পুরোনো এক দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটাল।
রোববার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারার বৃষ্টিতে ছয় ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় যা প্রায় একশ মিলিমিটার ছুঁয়েছে। মোহাম্মদপুর থেকে মালিবাগ, মতিঝিল থেকে মিরপুর, হাতিরঝিল থেকে বনানী-খিলক্ষেত- নগরীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে সড়ক ডুবে গেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে।
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিসগামী মানুষ, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী- সবাইকেই পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে। কাউকে গাড়ি ঠেলে নিতে হয়েছে জলাবদ্ধ সড়কে, কাউকে কোমড়সমান পানি পার হতে হয়েছে। এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রতি বর্ষায়, ভারী বৃষ্টিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর একই চিত্র দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো- কেন প্রতিবছর একই দুর্ভোগ ফিরে আসে? উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতার চিত্র। শহরের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ ছিল যেসব খাল, নালা ও জলাধার, দখল আর ভরাটে সেগুলোর অস্তিত্ব আজ সংকুচিত।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ সরু হয়ে এসেছে, অথচ নতুন সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ যে হারে হয়েছে, সেই অনুপাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটেনি। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়াও এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে।
রাজধানীর বাইরেও চিত্র ভিন্ন নয়—বগুড়ার মতো জেলা শহরেও সরকারি মানচিত্রে থাকা অনেক খাল ও ছোট নদী বাস্তবে দখল-ভরাটে বিলুপ্তপ্রায়। এর প্রভাব শুধু জলাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, নদীর নাব্যতা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদেও তার আঘাত পড়ে।
দায়িত্বের বিভাজনও এ সংকটকে জটিল করে তুলেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক- একাধিক সংস্থার হাতে ছড়িয়ে থাকা দায়িত্বে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকল্প বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করে, প্রত্যাশিত ফলও অধরা থেকে যায়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কথা নগর পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন- প্রয়োজন একীভূত ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ, যার হাতে জবাবদিহি ও সমন্বয় উভয়ই থাকবে।
সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ যে একেবারে নেই, তা নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন শতাধিক জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করে সেখানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল মোতায়েন করেছে, জিয়া সরণি খাল, কাজলা খাল, শ্যামপুর খালসহ প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার খাল উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, আসছে অর্থবছরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দও প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে সারা দেশে বিশ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের একটি বৃহৎ কর্মসূচিও চলমান, যার অগ্রগতি ইতোমধ্যে অর্ধেক ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এত পরিকল্পনা ও বরাদ্দের পরও প্রতি বর্ষায় নগরবাসীকে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে-পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটাই আসল সংকট।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে বলে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এখন দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নগর এলাকার সব জলাবদ্ধতা-সংক্রান্ত সংস্থাকে একক ছাতার নিচে এনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ও জবাবদিহিমূলক একটি সমন্বিত নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি।
দখল হওয়া খাল ও নদী দ্রুত জরিপ করে সীমানা চিহ্নিত করা হোক এবং উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। বর্ষা শুরুর আগেই সব ড্রেন, নালা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশেই কমে যাবে।
সবশেষে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে এমন জলাধার ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং অবকাঠামো তৈরির নীতি গ্রহণ করা হোক, যাতে অতিরিক্ত পানি বিপর্যয় না হয়ে সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে।
কেকে/ এমএস