‘এসো হে নবীন, বাজিয়ে সুর-লহরী উল্লাসিত নব বীণ।’ নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করতে এমন বাক্যই যেন উচ্চারিত হচ্ছে প্রবীণদের সম্মিলিত কণ্ঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন। কিছুটা জড়তা আর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে প্রবেশ। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব উচ্চমাধ্যমিকের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন চিরায়ত মুক্ত-জ্ঞানচর্চার রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছেন নবীন শিক্ষার্থীরা। একরাশ প্রত্যাশা আর হাজারও স্বপ্ন নিয়ে আসা নবীন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাস। নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের।
গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বুধবার (১৫ জুলাই) ডিপার্টমেন্ট ভিত্তিক ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শুরু হয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া জিএসটি গুচ্ছভুক্ত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা শিক্ষার্থীরা প্রথম দিনেই ছিলেন উচ্ছ্বসিত। প্রকৃতি ঘেরা সৌন্দর্যবেষ্টিত ১৭৫ একর ক্যাম্পাসে ব্যস্ত সময় পার করছেন নবীন শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাসে দেখা গেছে— বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাল চত্বর, শহীদ মিনার, বটতলা, আমতলা, ডায়না চত্বর, জিয়া মোড় ও বিভিন্ন বিভাগের করিডোরে বসে আড্ডায় মেতেছেন একঝাঁক নবীন শিক্ষার্থী। সর্বত্র যেন তাদেরই আনাগোনা। কোথাও আবার দেখা মিলছে নবীন-প্রবীণদের পরিচয়পর্বও। তবে পরিচয় পর্ব নামে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। র্যাগিং বা বুলিং পর্যায়ে গেলে তো বিপদ।
প্রতিটি বিভাগেই যেন উৎসবের আমেজ। নবীনবরণ উপলক্ষে আগত নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় সকাল থেকেই মুখরিত পুরো ক্যাম্পাস। নতুন পরিবেশে নতুন মানুষদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিভাগগুলোতে চলছিলেন পরিচিতি পর্ব। বিভাগগুলোতে আগত নতুন শিক্ষার্থীদের প্রথমেই ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।
ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতিমূলক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার জন্য নবীনদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রবীণরাও নবীনদের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বিতরণ করে রজনীগন্ধা ও লাল গোলাপ। বরণ শেষে নবীনরা একে অপরের সাথে মেতে উঠে গ্রুপ-সেলফি তোলা ও খুঁনসুটিতে।
সবকিছু ছাপিয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নবীন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল ক্যাম্পাসের আড্ডাস্থলগুলো। এছাড়া টিএসসিসি’র ক্যাফেটেরিয়া ও আমতলার আশপাশের চায়ের টং দোকানগুলোতেও ছিল তাদের সরব আনাগোনা।
প্রথমদিনে অনুভূতি প্রকাশ করে ইংরেজি বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী অহনা জোয়ার্দার বলেন, আজকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমাদের এই নবীন বরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলো। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বপ্নের বিভাগে ভর্তি হয়ে অনেক আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। বিশ্ববিদ্যালয় শেষে বিসিএস-এ শিক্ষা ক্যাডার হতে চাই।
আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী সুচিত্রা সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনটি অনেক আনন্দের ও আবেগপ্রবণ হয়েছি। বিভাগের নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনেক সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে। আজকের দিনটি মনে রাখার মতো দিন।
জার্নালিজম বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান বলেন, অনেক অপেক্ষার পর আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমদের বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে অনেক ভালো লাগছে। আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। আমরা যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেন ধারণ, লালন ও রক্ষা করতে পারি।
রুবাইয়া খাতুন নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, নতুন ক্যাম্পাসে এসে নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে পরিচিত হচ্ছি। আজ থেকে নতুন এক জীবন শুরু হচ্ছে আমাদের। আল্লাহ্'র কাছে শুকরিয়া যে আমাকে এখানে পড়বার সুযোগ করে দিয়েছেন।
এদিকে নবীনদের আগমন ঘিরে র্যাগিং ও বুলিং নিয়ে কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান। তিনি বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং ও বুলিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নবীনদের র্যাগিং কিংবা বুলিং করে এবং প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একাডেমিক ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে লোক প্রশাসন বিভাগে উপস্থিত হয়ে নবীনদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, যারা ভর্তির সুযোগ পেয়েছো নিঃসন্দেহে তোমাদের পরিবার পরিজন অনেক কষ্ট করে তোমাদেরকে আজ এই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেছে। এদেশের সাধারণ মানুষ যাদের অর্থায়নে এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় তাদের প্রতি তোমাদের একটা দায়বন্ধতা থাকবে। এখানে যারা শিক্ষকতায় নিয়োজিত রয়েছেন তারা যোগ্য, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এই দেশ একটি সম্ভাবনার দেশ; তোমরা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সহযোগিতায় তোমাদের মেধার চর্চার মধ্য দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান, সমৃদ্ধি বাড়িয়ে তুলবে এই আশা রাখি। আমি তোমাদের সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
কেকে/ এমএস