ছোটবেলায় জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর বদলে যায় দুই ভাই-বোনের স্বাভাবিক জীবন। স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা, খেলাধুলা কিংবা বেড়ে ওঠার অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও পড়াশোনা থেকে সরে যাননি তারা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকট পেরিয়ে প্রতিবন্ধী আনিছুর মাস্টার্স শেষ করেছেন। অন্যদিকে তার শারীরিক প্রতিবন্ধী বোন আমেনা এইচএসসি পাস করে হোসেনপুর ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রি ১ম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন মা। তাদের মা সন্তানদের প্রতিবন্ধকতাকে বোঝা মনে না করে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কখনো কোলে, কখনো কাঁধে করে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে গেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন, ছেলে একদিন সরকারি চাকরি করবে, মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সন্তানদের সুখের কথা ভাবতে ভাবতে ২০২২ সালে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি।
এখন অসুস্থ বাবাও আগের মতো কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারে নেমে এসেছে আরও কঠিন বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে চাকরির চেষ্টা করেও সুযোগ না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চরপুমদী ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের দুই প্রতিবন্ধী ভাই-বোন মো. আনিছুর রহমান ও আমেনা আক্তারের।
তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়—শিক্ষাগত যোগ্যতা ও তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধীকতার বিষয়টি বিবেচনা করে একটি সম্মানজনক চাকরির সুযোগ। এতে তারা কারও কাছে হাত না পেতে নিজেরাই নিজেদের জীবন চালাতে চান।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জন্মের সময় আনিছুর রহমান ও আমেনা আক্তার দুজনই স্বাভাবিক ছিলেন। আনিছুরের বয়স যখন পাঁচ বছর এবং আমেনার সাত বছর, তখন তারা জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। একপর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সন্তানদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানেননি তাদের বাবা-মা। আর্থিক সংকট থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, ছোটবেলায় আনিছুরকে তার মা কখনো কোলে, কখনো কাঁধে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্কুলে যাওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু মায়ের দৃঢ়তার কারণে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, আনিছুর ও আমেনার বাবা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে জালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। সেই সামান্য আয় থেকেই সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করতেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি।
আনিছুর রহমান ২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর শুরু হয় চাকরির জন্য তার দীর্ঘ অপেক্ষা।
আনিছুরের দাবি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি চাকরিতে আবেদন করেছেন। অংশ নিয়েছেন বহু নিয়োগ পরীক্ষায়। কিন্তু এতদিনেও কোনো চাকরি পাননি। চাকরির আবেদন ফি, পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচ জোগাড় করাও পরিবারের জন্য কঠিন ছিল। জালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালানো বাবা অনেক কষ্টে ছেলের চাকরির আবেদনের খরচ জুগিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, আনিছুরের মা সবসময় চাইতেন তার ছেলে একদিন সরকারি চাকরি করবে। ছেলের চাকরির আশায় তিনি বিভিন্ন মানুষের কাছেও গিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলের চাকরি পাওয়ার খবর দেখে যেতে পারেননি তিনি।
২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আনিছুর ও আমেনার মা। তার মৃত্যুর পর দুই ভাই-বোন শুধু একজন মাকে নয়, হারান তাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গাটিও।
আনিছুর রহমান বলেন, “আমার মা চাইতেন, আমি চাকরি করে নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব নেব। প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়—এটাই ছিল মায়ের স্বপ্ন। আমার জন্য চাকরির আশায় মা অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও সহযোগিতা পাননি।”
মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আনিছুর। তার কাছে চাকরি এখন শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার বিষয় নয়; মৃত মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণেরও একটি পথ।
মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বাবা মো. ছিদ্দিক হোসাইন, স্থানীয়ভাবে আবু ছিদ্দিক নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে হাটে-বাজারে ঘুরে জালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন তিনি।
কিন্তু বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তিনি। ফলে নিয়মিত বাইরে গিয়ে জালমুড়ি বিক্রি করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
আনিছুর জানান, বর্তমানে তিনি সামান্য কম্পিউটারের কাজ ও টুকটাক আয় করে কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। সংসারের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আনিছুর বলেন, “আমরা সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। কারও কাছে হাত পাততে বা ভিক্ষা করতে চাই না। আমরা ছোটখাটো একটি সরকারি চাকরি করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
ভাইয়ের মতো বোনেরও আত্মনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন
আনিছুরের মতো তার বোন আমেনা আক্তারও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তার বয়স ৩০ বছর। অর্থের অভাবে আমেনার পড়াশোনা বন্ধ।
আমেনা বলেন, “আমাদের মা মারা গেছেন। মায়ের অনেক আশা ছিল, আমরা যেন একটি সরকারি চাকরি পাই। এখন আমাদের একটাই চাওয়া—আমরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারি।”
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বপ্ন রয়েছে আমেনার। তিনি আত্মনির্ভর হতে চান এবং পরিবারের দায়িত্বে ভূমিকা রাখতে চান। একটি চাকরি পেলে নিজের পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি। এছাড়াও শারীরিকভাবে অক্ষম আমেনার কোন জায়গায় বিয়ে সাধিও হচ্ছে না।
দুই সন্তানকে পড়াশোনা করাতে গিয়ে জীবনের বড় একটি সময় সংগ্রাম করেছেন বাবা মো. ছিদ্দিক হোসাইন। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো তার জন্য সহজ ছিল না।
ছিদ্দিক হোসাইন বলেন, “আমার ছেলে আনিছুর মাস্টার্স পাস করেছে। মেয়ে আমেনা ডিগ্রি ১ম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে। সন্তানদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, কিন্তু তারা পড়াশোনা করেছে এবং নিজেদের যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেছে।”
তিনি বলেন, “আমি এখন নিজেও অসুস্থ। হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে আগের মতো কাজ করতে পারি না। আমার একটাই চাওয়া—আমার ছেলে-মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা হোক। তাহলে তারা নিজেদের জীবিকা নিজেরাই চালাতে পারবে এবং কারও কাছে হাত পাততে হবে না।”
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসবেন—এমন তথ্যের কথা উল্লেখ করে আনিছুর রহমান বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একবার দেখা করতে চান। মাত্র এক মিনিট সময় পেলেও তাদের পরিবারের কষ্টের কথা জানাতে চান তিনি।
আনিছুর বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের কষ্টের কথা বলতে চাই। মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেও যেন মানুষের কাছে হাত পাততে না হয়। আমরা ছোটখাটো একটি চাকরি করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, “সে আমার কাছে এসেছিল। সুযোগ হলে আমি তাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।”
তাদের প্রত্যাশা, সরকারি বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রতিবন্ধিতা ও পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে। আনিছুর ও আমেনার ভাষায়, তারা দয়া চান না—চান একটি সুযোগ। সেই সুযোগ পেলে নিজেদের যোগ্যতা ও শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করতে চান, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান এবং মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে চান।
কেকে/ এমএস