বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আসছে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’: প্রধানমন্ত্রী      ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী      শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের লংমার্চ      রাজধানীর উত্তরার সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ পুলিশের       পাচার ও চোরাচালান রুখতে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      আন্দোলনের শঙ্কায় পরীক্ষা শেষে সন্তানদের নিতে কেন্দ্রে অভিভাবকরা      শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর একটি করে গাছ লাগানোর আহবান প্রধানমন্ত্রীর      
দেশজুড়ে
তিন প্রজন্মের ১১ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, সহায়তার অপেক্ষায় পরিবার
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ৭ নম্বর কামারচক ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামে একই পরিবারে তিন প্রজন্মের ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভাঙা ও জরাজীর্ণ ঘরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বৃষ্টিতে পোহাতে হয় তাদের অসনীয় ভোগান্তি। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। বর্ষা এলেই হাওরের পানিতে তলিয়ে যায় বসতভিটা। নেই পর্যাপ্ত খাবার। শরীরে চিকিৎসার করানোর নেই প্রয়োজনীয় অর্থকড়িও। অভাব-অনটন যেন এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যার দুর্ভোগ। গত কয়েকদিন আগে মনু নদীর বাঁধ ভেঙে তাদের বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। চরম দারিদ্র্য, নদীভাঙন এবং বন্যার দুর্ভোগ সব মিলিয়ে দুঃখকষ্টে দিন কাটছে তাদের। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, করাইয়া হাওরপাড়ে জরাজীর্ণ একটি বাড়িতে বসবাস করছেন সহোদর দুই ভাই কামাল মিয়া মুন্সি ও লাফুল মিয়া মুন্সি। এই পরিবারের ১১জন সদস্যই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। 

দৈনিক খোলাা কাগজের সঙ্গে আলাপকালে বয়োবৃদ্ধ কামাল মুন্সি (৮০) বলেন, তাদের পরিবারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ইতিহাস তিন প্রজন্মজুড়ে। দুই ভাইয়ের দাদা ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের বাবা শৈশবে চোখে দেখলেও ১০-১১ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হন দুই ভাই। বর্তমানে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি।

কামাল মিয়ার পরিবারের সদস্যরা হলেন তার ছেলে জগলু মিয়া (২৭), ফখরুল মিয়া (২৬), মেয়ে সুফি বেগম (৩৮), নাতি সোহান মিয়া (১৫), নাতনি শারমিন বেগম (১৫) ও ফাইজা বেগম (৬)। তারা সবাই জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এর মধ্যে সোহান বাকপ্রতিবন্ধি এবং শারমিন মানসিক প্রতিবন্ধিতারও শিকার। 

অন্যদিকে লাফুল মিয়া মুন্সির (৭০) পরিবারে তিনি নিজে ছাড়াও ছেলে সারজক মিয়া (২৮), নাতি আকবর আলী (৬) ও নাতনি আনিকা আক্তার (২) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি।

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এ পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা দৃষ্টিহীন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তারা তীব্র অভাব-অনটনের মধ্যদিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটানোই এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাভাবে বর্তমানে চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় তারা কোনো কাজ করতে পারেন না, আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কাজের সুযোগও দেন না। ফলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করেই চলছে দুই পরিবারের জীবন। সাম্প্রতিক নদীভাঙনে সৃষ্ট বন্যায় তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি পানি বন্দি থাকায় তারা কয়েকদিন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছেন।

সম্প্রতি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি পরিবারের পানিবন্দি ও দুঃখ দুর্দশার খবর পেয়ে রাজনগর উপজেলা ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি পরিবারের পাশে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা পৌছে দেওয়া হয়েছে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, সংবাদিকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গত সোমবার বিকালে রাজনগর উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদারসহ প্রশাসনে অনেক কর্মকর্তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধির বাড়িতে সহায়তা নিয়ে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা প্রতিবেশী মাসুক মিয়া বলেন, কামাল মুন্সির পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিসহ পরিবারে ১১জন সদস্য দৃষ্টিপ্রতিন্ধি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তারা টিনশেডের ছোট্ট একটি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশায় দিন পার করছেন। এই পরিবারটির জন্য সরকারি আবাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে।

কামাল মিয়া মুন্সি বলেন, আমরা বাপ-দাদার আমল থেকেই চোখে দেখি না। আমাদের ছেলে-সন্তান, নাতি-নাতনিও চোখে দেখে না। দৃষ্টিপথ্রতিবন্ধি থাকার কারণে আমারা কোনো কামকাজ করতে পারি না। আমাদের অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন চালাতে হয়। খুবই দুঃঅকষ্টে দিন কাটাচ্ছি। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি সুফি বেগম জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধির পাশাপাশি বাকপ্রতিবন্ধি এবং মানসিক ভারসাম্যহীন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমরা কাজকর্ম করতে পারি না। কেউ আমাদের কাজেও নেয় না। আমরা খুব কষ্ট করে নিজেরা রান্না করে খাই। একবেলা খেলে তিনবেলা খেতে পারি না। নেই থাকার জন্য ভালো একটি ঘর। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘরের বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে ভেতরে পড়ে। সংসারে আয় রোজগারের স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমাদের দিকে একটু সুনজর দিতেন, তাহলে অনেক উপকার হতো। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি সারজক মিয়া বলেন, আমার বাবাও অন্ধ ছিলেন, আমার দাদাও অন্ধ ছিলেন। আমরা চোখে দেখি না, কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। মানুষের দয়ায় কিছু খাবার পাই, তা দিয়েই খাই। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি ফখরুল মিয়া বলেন, আগে কোনো সহায়তা পাইনি। এখন বন্যার কারণে সাংবাদিক ভাইয়েরা আসার পর জেলা ও উপজেলা থেকে স্যারেরা এসেছেন। তারা কিছু সাহায্য দিয়েছেন। সবাই যদি আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন, সাহায্য সহযোগিতা করেন তাহলে আমাদের পরিবার বেঁচে যাবে। 

জানতে চাইলে রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি পরিবারটির ১১ জনের মধ্যে বর্তমানে ৮ জন প্রতিবন্ধি ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন আবেদন করলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি পরিবারের দুর্দশার  বিষয়টি জানার পর আমরা সরেজমিনে দিয়ে ওই বাড়িতে সহায়তা পৌছে দিয়েছি। ভবিষ্যতেও তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, আমি সরজমিনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের হাতে সাদা ছড়ি, আর্থিক সহায়তা ও খাদ্য পৌছে দিয়েছি। এছাড়া তাদের বাড়িতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাঠিয়ে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি তাদের ভাঙাচোরা ঘর নির্মাণ ও বাড়ির যাতায়াতের কাঁচা সড়ক সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে রাজনগরের একই গ্রামে গ্রামে জমজ ৩ সন্তান জন্ম দেয়া দরিদ্র রিবিল মিয়া ও সেলিনা দম্পতির পরিবারটিও  অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। শিশুদের চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থান নির্মাণে সরকারসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছে এ পরিবারটি। সরকারসহ দেশের ও প্রবাসের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে অসহায় পরিবারে দুর্দশার চিত্রটি বদলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী   সহায়তা   পরিবার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close