দেশজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে অনলাইন জুয়া। সামাজিক মাধ্যমে জুয়ার আকর্ষণীয় ও চটকদার বিজ্ঞাপনে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন ভয়াবহ জুয়ার ফাঁদে। আর এতে আসক্ত হয়ে শেষমেষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেকে। বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অশান্তির মতো ঘটনা। এমনকি ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী। অন্যদিকে জুয়ার জালে পড়েছে একদল অসাধু মানুষ অবৈধভাবে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে দেশের টাকা।
জাান গেছে, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন ক্যাসিনো, বেটিং ও গেমিং অ্যাপের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। প্রথমদিকে সামান্য কিছু টাকা জেতার সুযোগ পেলেও পরবর্তীতে বড়ো অঙ্কের টাকা হারিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই আসক্তি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
এদিকে দেশে অনলাইন জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার দশম বৈঠকে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনটির খসড়া উপস্থাপন করা হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। যা গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন এই আইনে অনলাইন জুয়া ও দূরবর্তী জুয়ায় জড়িত থাকার জন্য অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
যেভাবে জুয়ার ফাঁদে মানুষ : একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন তাসলিম হোসেন। একদিন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভেসে ওঠে জুয়ার সাইটের (বাবু ৮৮৮) বিজ্ঞাপন। কৌতূহলবসত জুয়ার সাইটে তিনি ঢুকে পড়েন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১ হাজার টাকা জমা করে ক্যাসিনো খেলা শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে তার এই ১ হাজার টাকা ২৫ হাজার টাকা হয়ে যায়। সেই থেকে শুরু। কয়েকদিনের মধ্যে জুয়া খেলা তার নেশায় পরিণত হয়ে যায়। হারতে থাকেন। আবার জিততেও থাকেন। মাত্র এক মাসের মধ্যেই ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ১৮ লাখ টাকা জুয়ার পেছনে খোয়ান। কিন্তু থেমে যাননি তিনি। আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আরও ৯ লাখ টাকা ধার করেন। চাকরির বেতনে চলা ইসহাক মুন্সির জীবন এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত। পাওনাদারদের ভয়ে ছেড়েছেন চাকরি। বাসাতেও থাকতে পারেন না। এখন তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বাড়ছে পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা : সহজে ও দ্রুত টাকা আয়ের আশায় অনেকেই প্রথমে অল্প টাকা বিনিয়োগ করলেও পরবর্তীতে হারাচ্ছেন সর্বস্ব। এর ফলে এলাকায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে তীব্র পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা।
সাভার পৌরসভার এক চায়ের দোকানদার রাসেল জানান, প্রথমে এক কাস্টমারের মাধ্যমে তিনি এই অনলাইন জুয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। ওই কাস্টমারকে মোবাইলে অনলাইন গেম খেলতে দেখে তার নিজেরও আগ্রহ তৈরি হয়। পরে নিজের স্মার্টফোনে ৩০০ টাকা বিকাশ করে খেলা শুরু করেন। প্রথম দিনেই ৩০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১ হাজার ২০০ টাকা জিতে যান তিনি। এরপর আরও বেশি লাভের আশায় বারবার টাকা বিনিয়োগ করতে থাকেন। রাসেল বলেন, ‘শুরুর দিকে কিছু টাকা জিতলেও পরে যা জিতছি তার চেয়ে বেশি হারাইছি। এখন এই অনলাইন জুয়া আমার কাছে নেশার মতো হয়ে গেছে। চাইলে এখন আর ছাড়তে পারি না।’ তিনি আরও জানান, দোকানে প্রতিদিন যা আয় হয়, তার বেশির ভাগই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইন গেমে চলে যায়। এক সময়ের পণ্যে ভরা তার দোকানটি এখন জুয়ার আসক্তিতে প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এক ব্যক্তির স্ত্রী জানান, তার স্বামী বাসায় ফিরেই সব সময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং সামান্য বিষয়েও মেজাজ খিটখিটে করে রাখেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী মোবাইলে অনলাইন জুয়া খেলেন এবং সেখানে নিয়মিত টাকা বিনিয়োগ করেন। তিনি বলেন, ‘জিতলে তার মন ভালো থাকে, আর হারলে ঘরের সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আগে আমাদের পরিবারে সুখ-শান্তি ছিল। এখন এই অনলাইন জুয়া আমাদের পারিবারিক সুখ শেষ করে দিতাছে।’
প্রতিদিন লেনদেন ৫ কোটি টাকা : গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এ সময় মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ৬ হাজার ৬০০টি সিম কার্ডও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হত।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, টঙ্গীর একটি রিসোর্ট এবং কুমিল্লার একটি হোটেলে আলাদা অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলেন আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।
ডিবি কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের সময় এমএফএস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ৬ হাজার ৬০০টি সিম কার্ড ছাড়াও আরও ৬৭টি সিম কার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম জানান, সাইবার নজরদারির মাধ্যমে ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কয়েকটি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করেন। তদন্তে দেখা যায়, এসব প্ল্যাটফর্মে এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন চলছিল। সেখান থেকেই অনলাইন জুয়ার এই চক্রটির সন্ধান পায় ডিবি।
ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, চক্রটি বড় বড় রেজিস্টার খাতায় হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের হিসাব রাখত এবং খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাদের কার্যক্রম চালাত।
শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে চালানো বেশ কয়েকটি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপের পেছনে থাকা পেমেন্ট কোম্পানিগুলো চীনা নাগরিকেরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি জানান, স্থানীয় পর্যায়ে লেনদেনের জন্য অপারেটররা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে এমএফএস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করতেন। জব্দ করা ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, চক্রটি প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রের মূল হোতা ‘নাতান’ নামের এক চীনা নাগরিক। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
কেকে/এলএ