টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় গত সোমবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে যেতে চরম অসুবিধা ও ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। পরিস্থিতির বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত না করে চালিয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অসন্তোষ তৈরি হয় ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় কিছু শিক্ষার্থী রাজপথে নামে। যাকে পুঁজি করে পরবর্তীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে শিক্ষার্থীদের নামে হঠাৎ জমায়েত হতে থাকে একদল তরুণ-যুবা। একপর্যায়ে রাস্তা আটকে, গাড়ি ভাঙচুর করে, শিক্ষা বোর্ডের ফটক ভেঙে সহিংসতার সৃষ্টি করা হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নামে সুযোগসন্ধানী একটি মহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে। যদিও সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের আড়ালে কারা আসলে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশকে ঘিরে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তির পাশাপাশি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কিছু দলও পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে পতনের পর থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাঁয়তারা করছেন। তাঁর এ ঘোষণার পরই হঠাৎ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে পুঁজি করা হলো। এটা মোটেও কাকতালীয় নয়। এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলেন, এই আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছে, তাদের অনেকেই বয়সে কম হলেও নিয়মিত শিক্ষার্থী নয়। অনেক ড্রপআউট শিক্ষার্থীও রয়েছে। তারাই মূলত বাস ভাঙচুরসহ সহিংসতা করেছে। রাস্তা অবরোধ, জাতীয় সংসদের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা মোটেও নির্দোষ আন্দোলন নয়। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইন্ধন ও পরিকল্পনায় একদল সুযোগসন্ধানী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবেশ করে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সামনে রেখে কেউ কেউ ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকারকে বিব্রত করতে একটি মহল যে রয়েছে, তা দৃশ্যমান। তারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে এই আন্দোলন করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা আন্দোলন করছে, তাদের মধ্যে অনেকে পরীক্ষার্থী নয়। পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। যারা পরীক্ষার্থী, তারা সরকারের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট। সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এই আন্দোলনকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, কারণ, যারা আন্দোলন করছে, তাদের সংখ্যা বেশি নয়।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিবালয়ে ঢুকে দাবি আদায়, পরীক্ষা স্থগিত বা বিনা পরীক্ষায় পাসের মতো একটি ‘অপসংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেই প্রবণতার ধারাবাহিকতা এখনো দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হতে দেবে না। নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নেবে সরকার। বাংলাদেশের শিক্ষার মান পুনরুদ্ধার করে জ্ঞানসমৃদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক একটি জাতি গড়ে তুলতে চায় বর্তমান সরকার।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) সরকারের সময় অটোপাস, অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া এবং ঢালাওভাবে জিপিএ-৫ দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব কারণে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে গুজব-অপপ্রচার
আন্দোলনের শুরু থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার দেখা গেছে। ছড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের পোস্ট, ভিডিও ও কথিত ফটোকার্ড। এর মধ্যে একটি ভাইরাল ভিডিওতে এক তরুণীকে বলতে শোনা যায়, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চান। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন। ভিডিওটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও ওই তরুণীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ ওঠে, বহিরাগত কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করে আন্দোলনের গতিপথ ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাখা ছাত্রলীগের কর্মীরা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামে কিছু কথিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেন। অথচ সেটি ছিল একেবারেই ভুয়া। মূলত এর মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে পুরোনো ভিডিও বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে পুনরায় প্রচারের অভিযোগও উঠেছে। ইতোমধ্যে ভোলায় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের মতে, এ ধরনের কনটেন্ট আন্দোলন ঘিরে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে আন্দোলন দমনে ছাত্রদল মাঠে নেমেছে—এমন দাবিতে একাধিক কথিত ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে ফরিদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো কিংবা সায়েন্সল্যাবে দুজন নিহত হওয়ার মতো দাবিও বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রচার করা হয়। তবে এসব দাবির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক তথ্য ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও এ বিষয়ে নানা প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে জড়িয়ে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। আন্দোলনের নামে সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা, ভুয়া পরিচয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের অভিযোগসহ কয়েকটি ঘটনার সঙ্গেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করা এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। তবে তারা সফল হতে পারেনি।
এদিকে ভোলায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বুধবার ভোরে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাক আহমেদ শাহীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের সমন্বিত দল। জেলা শহরের মুসলিমপাড়ার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কেকে/এলএ