ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতার ওপর অতর্কিত হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ফুঁসে ওঠছেন শিক্ষক সমাজ। চেচুয়া চন্ডিমন্ডপের প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় দখল নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রভাবশালীরা এ কাণ্ড ঘটায়। এদের সঙ্গে স্কুল নিয়ে দ্বন্দ্ব ও ৬০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি মামলা রয়েছে। শিক্ষককে উদ্ধার করতে গিয়ে হামলা ও লুটপাটের শিকার হন তার ভায়রা। সূত্র মতে, বাজারের একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হামলা এবং শিক্ষককে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এর আগে ২১ জুন মারধর করা হয় সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান মাসুদকে। আহত শিক্ষক নুর ইসলাম ও তার ভায়রা জুলহাস উদ্দিন মামলা দায়েরের জন্য বুধবার রাতে মুক্তাগাছা থানায় অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত মামলা রেকর্ড হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
জানা যায়, শিক্ষক নুর ইসলাম (৪২) প্রতিদিনের মতো বুধবার (১৫ জুলাই) বিকালে চেচুয়া বাজারে যান। পৌনে ৬টায় বাবুল পালের দোকানের সামনে থেকে এমরান মাসুদ কবীর ও মানিক মিয়া জোর করে তাকে কয়ারী জুয়েলার্সে নিয়ে আটকায়। চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। তার কাছে থাকা ব্যাংকের ভিসা কার্ড ও স্বাক্ষর করা ১০ লাখ টাকার চেক ছিনিয়ে নেয়। দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে লোকজন নুর ইসলামকে উদ্ধার করেন। ভায়রা তাকে উদ্ধার করতে গেলে তার দোকান ভাঙচুর করে ৭৬ হাজার ৫০ টাকা ও লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাদের পরামর্শে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর নুর ইসলাম মামলা দায়েরের জন্য থানায় যান।
সূত্র জানায়, মুক্তাগাছার চেচুয়ায় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যাচ্ছে তা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে প্রভাবশালীরা। পরিস্থিতি এলাকা লিজ নেওয়ার মতো। সব কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। দেখার যেন কেউ নেই। প্রভাবশালীরা দেড় বছর ধরে প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় গ্রাস করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তারা পুলিশ ম্যানেজ করে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা নুর ইসলামকে মুক্তাগাছা থানার ২টি রাজনৈতিক মামলাসহ ৩টি মামলায় ২ মাস ৭ দিন জেল খাটায়। পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষক পরিবারকে। হুমকি দেওয়া হয় এলাকা ছাড়া করার।
জানা যায়, প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় দখল নিয়ে দেড় বছর ধরে চরম দ্বন্দ্ব চলছে। প্রভাবশালীরা এক পক্ষের হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা নুর ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। গত ৪ জুন মিথ্যা মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১০ দিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। জামিন শুনানির দিন মুক্তাগাছা থানার একটি রাজনৈতিক মামলায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানালে বিজ্ঞ বিচারক রাগান্বিত হয়ে নামঞ্জুর করেন। এর আগে নুর ইসলামকে বিদ্যালয় ও এলাকা ছাড়া করতে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ মুক্তাগাছা থানার রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করানো হয়।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে প্রধান শিক্ষক নুর ইসলাম পুনরায় বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ওই দিনই চেচুয়া বাজার থেকে রাজনৈতিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়া হয়। আড়াই লাখ টাকায় মুক্তাগাছা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কাণ্ড ঘটান। তাকে আবারও মুক্তাগাছা থানার অন্য ২টি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সূত্র মতে, মহা ষড়যন্ত্রের শিকার শিক্ষক নুর ইসলাম বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার আমলে ২০০২ সালে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন।
জানা যায়, সুখ নগরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ২০১২ সালে প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর পর বিধি অনুযায়ী ২০১৬ সালে নুর ইসলাম প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর ২০২১ সালে বিদ্যালয় এমপিভুক্ত হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ভালোই চলছিল বিদ্যালয়টি। ২০২৫ সালে শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া কয়েক শিক্ষক। তাদের সহযোগিতা করছেন প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তারা। অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ দায়িত্বে থাকা ৬ জনের বিরুদ্ধে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন বিদ্যালয়ের ৩ সিনিয়র শিক্ষক, জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অভিযোগে বলা হয়, অবৈধভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মর্জিনা আক্তার, লিয়াকত আলী, শফিকুল ইসলাম, উম্মে হাবিবা, লাল চান মিয়া ও ফাহিমার নিয়োগ অবৈধ। তারা জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তাদের বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই।
কেকে/এলএ