গাজীপুরের কাপাসিয়া টু কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের চাকৈল ব্রিজ থেকে দুলান বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৫টি স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির কোনো সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক, রোগীবাহী যানবাহন ও বিভিন্ন ধরনের পরিবহনচালকদের। বর্ষা মৌসুমে গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কটি এখন যেন দুর্ঘটনার এক নীরব ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলার মধ্যে অন্যতম প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম এই আঞ্চলিক সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটি এখন চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো সড়ক কাদাময় হয়ে যায়। বড় বড় গর্তে পানি জমে থাকায় কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত তা বোঝার উপায় থাকে না। ফলে প্রায়ই অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় ছোট যানবাহনগুলোকে অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই পাশ কাটিয়ে যেতে হয়।
চাঁদপুর বাজারের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, “তিন বছর ধরে রাস্তাটির কোনো সংস্কার হয়নি। ধুলো, কাদা আর গর্তের কারণে ব্যবসায় পরিচালনা ও চলাচল—দুই দিক থেকেই আমরা ভোগান্তিতে আছি। ক্রেতারাও অনেক সময় বাজারে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন।”
অটোরিকশা চালক আরিফ হোসেন জানান, চাঁদপুর বাজার থেকে দুলান বাজার পর্যন্ত অন্তত ২৫টি স্থানে বড় বড় গর্ত রয়েছে। বৃষ্টির সময় গর্তে পানি জমে থাকায় রাস্তার অবস্থা বোঝা যায় না। প্রায় প্রতিদিনই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। যাত্রী নিয়ে নিরাপদে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক সোলাইমান বলেন, “ভাঙা সড়কে চলতে গিয়ে প্রায়ই গাড়ির সাসপেনশন, টায়ার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে আয় কমে যাচ্ছে, আবার যাতায়াতে অতিরিক্ত সময়ও লাগছে।”
যাত্রী মোর্শেদা বেগম বলেন, “বৃষ্টি হলে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত বোঝা যায় না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। গর্তের নোংরা পানি ছিটকে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়।”
কাপাসিয়া সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম খান বলেন, “আমি ফুলবাড়িয়া থেকে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করি। রাস্তার কারণে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে। অনেক সময় মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষকরাসহ শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা বাছির উদ্দিন বলেন, “ভাঙা রাস্তার কারণে বাজারে যাওয়া-আসা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আধা ঘণ্টার পথ যেতে এখন প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।”
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিনহাজ বলে, “স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। গাড়িতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। অনেক সময় সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারি না। কাদায় স্কুল ড্রেসও নষ্ট হয়ে যায়।”
চাঁদপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাজারের ইজারাদার সোলাইমান মোড়ল বলেন, “কালীগঞ্জ-কাপাসিয়া সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন। চাঁদপুর বাজারের চার রাস্তার মোড়ে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বাজার থেকে নিয়মিত রাজস্ব পেলেও বাজার ও সড়কের উন্নয়ন হচ্ছে না। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রায়ই যাত্রীরা অটোরিকশা থেকে পড়ে আহত হন।”
স্থানীয়রা জানান, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কৃষিপণ্য, ব্যবসায়িক মালামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী সোহেল রানা বলেন, “সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে। খুব শিগগিরই সংস্কার কাজ শুরু হবে।”
কেকে/এমএ