চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হালদা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সুন্দরপুর-সুয়াবিল ইউনিয়ন সংযোগের পাঁচপুকুরিয়া-সিদ্ধাশ্রম সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ২০ জুলাই। কিন্তু ৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও এখনো অসমাপ্ত রয়েছে সেতুর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে ১৫ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে যাতায়াতের সময়, বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ও।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় ‘গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’-এর অধীনে ২৪০.৪০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি। ৩০ মাস মেয়াদি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ২০ জুলাই। কিন্তু কাজ হয়েছে অর্ধেক। সেতুটির নির্মাণ কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহের অ্যান্ড ব্রাদার্স।
ফলে, পাঁচপুকুরিয়া সেতু প্রকল্পের বিলম্ব শুধু একটি নির্মাণকাজের ধীরগতির বিষয় নয়; এটি প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় এক বছর পর চূড়ান্ত নকশা হাতে পাওয়ায় কাজ পিছিয়ে যায়। অথচ সাধারণভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার আগে নকশা ও কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকার কথা। একইভাবে সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণও এখনো শেষ হয়নি, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও বিলম্ব সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দায় শুধু ঠিকাদারের ওপর বর্তায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ ও তদারকির প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি ৬০ শতাংশ কাজের অগ্রগতি হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) সরেজমিনে দেখা গেছে, পাইল, পাইল ক্যাপ, পিয়ার ও পিয়ার ক্যাপ নির্মাণ শেষ হলেও এখনো গার্ডার সংযোগ, ডেক স্লাব, স্টিলের কাজ, দুই পাশের সংযোগ সড়ক, নদী প্রতিরক্ষা ব্লক, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। বাস্তবে কাজের অগ্রগতি ৪০ শতাংশের বেশি নয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. শাহিন বলেন, ‘অর্থসংকট প্রকল্পে মুল বাধা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নকশা। কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় এক বছর পর চূড়ান্ত নকশা হাতে আসে। ফলে দীর্ঘ সময় কাজ শুরু করা যায়নি। সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণও এখনো শেষ হয়নি। এছাড়া, পাহাড়ী ঢল ও বন্যাও বাধা ছিল। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থ ছাড়ের তুলনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
সেতু না থাকায় সুন্দরপুর, পূর্ব সুয়াবিল, পাঁচপুকুরিয়া চাঁদের ঘোনা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষকে বিবিরহাট কিংবা নাজিরহাট যেতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে যাতায়াতে অতিরিক্ত দেড় ঘণ্টা সময় লাগছে। প্রতিজনের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে ১০০-২০০ টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা শফি কোম্পানি বলেন, ‘কবে হবে এই সেতু, তার কোনো হিসাব নেই। প্রতিদিন ১০-১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। আমাদের কষ্টের শেষ নেই।’
ভুক্তভোগী মো. ফারুক ও আপন নাথ জানান, সেতুটি হলে পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বদলে যাবে। কিন্তু কাজের গতি দেখে মনে হয়, শেষ হতে আরও কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।
স্থানীয় সংবাদকর্মী সাইফুর রহমান সোহান বলেন, ‘সেতুটি বহু মানুষ প্রাণের দাবি। কিন্তু ধীরগতির কারণে মানুষের মধ্যে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
এদিকে, কার্যাদেশ জারির দুই মাস সাত দিন আগে তৎকালীন সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশরের পক্ষে উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচএম আবু তৈয়ব নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। সে সময় এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে সেই সময়সীমার দ্বিগুণেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি এখনো চালু হয়নি।
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী জুনায়েদ আবছার চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের মূল কাঠামোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হালদা নদীর ওপরের অংশ ও দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ এখনো বাকি রয়েছে।’
কেকে/এমএ