মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভেজাল : আট পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ      ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩৭২      ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশীয় উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর      প্রধানমন্ত্রীর সাথে আইএলও মহাপরিচালকের বৈঠক, সহযোগিতা জোরদারের আশ্বাস      ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু      মোজাফফরের বিচার সেনা আইনে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      সিলেট-নেত্রকোনায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
এক পরিবারের কব্জায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বিতর্কিতরা নতুন পর্ষদে
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৫ এএম

বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদকে কেন্দ্র করে আইনগত বৈধতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, ফলে ব্যাংকটি কার্যত একটি ব্যবসায়িক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
 
একই সময় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে কেডিএসসংশ্লিষ্ট সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শতশত কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম, মালিকানা গোপন, অর্থপাচার, ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন ও খেলাপি ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ উঠে আসায় নতুন পর্ষদ গঠন নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ ঘিরে আইনগত বৈধতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা। তাদের দাবি, ব্যাংক কোম্পানি আইনের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে কেডিএস গ্রুপের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের একক নিয়ন্ত্রেণে চলে যাচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। 

একই সময় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে কেডিএসসংশ্লিষ্ট সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শতশত কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচারের অভিযোগ, মালিকানা গোপন, খেলাপি ঋণ সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘনের নানা তথ্য উঠে আসায় নতুন পর্ষদ গঠন নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৫ জুলাই আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির জন্য ১৪ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালককে অন্তর্ভুক্ত করায় নতুন পর্ষদের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ জন। তবে নবগঠিত এই পর্ষদ নিয়ে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। 

তাদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক বাদ দিলে অবশিষ্ট ১৪ জন পরিচালকের মধ্যে সাতজনই চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ অথবা খলিলুর রহমানের পরিবারের সদস্য কিংবা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তারা হলেন খলিলুর রহমান, কেডিএস গ্রুপের কর্ণধার; সেলিম রহমান, খলিলুর রহমানের ছেলে; আহমেদুল হক, খলিলুর রহমানের সহোদর; বদিউর রহমান, খলিলুর রহমানের ভাইয়ের সম্বন্ধী; মাহবুব আহমেদ, কেডিএস গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিনিধি; ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলস মিলসের প্রতিনিধি; এবং মো. শরিফ উদ্দিন তাসলিম, কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি। 

আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী, কোনো একক পরিবার থেকে ৩ জনের বেশি সদস্য একই সময়ে পরিচালক থাকতে পারবেন না। এ ছাড়া একটি পরিবারের অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ২টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচালক থাকতে পারবেন। অথচ আল-আরাফাহ ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদে খলিলুর রহমানের পরিবারের ৪ জন এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ মোট সাতজন সদস্য রয়েছেন, যা সুস্পষ্ট আইন লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নতুন এই পরিচালনা পর্ষদ ঘোষণার পর ব্যাংকটির সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত নতুন পর্ষদের মাধ্যমে কার্যত একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব আরও সুদৃঢ় করা হয়েছে।

সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের প্রভাব নতুন পরিচালনা পর্ষদে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাদের মতে, অতীতে কেডিএস গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ওই সময়ে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে।

সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ, ১৯৯৫ সালে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় ২৪ জন স্পন্সর পরিচালকের সমন্বয়ে প্রথম পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে ওই স্পন্সরদের মধ্যে চারজন মারা গেলেও বাকি অধিকাংশই জীবিত রয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য গঠিত পরিচালনা পর্ষদে তাদের অধিকাংশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক পরিবারের প্রভাব বাড়ানো হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।

শেয়ারহোল্ডারদের মতে, নতুন পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে কার্যত চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ এবং এর চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের পরিবারের হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, খলিলুর রহমান ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকালীন স্পন্সর ছিলেন না। এ বিষয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ বলছেন, খলিলুর রহমান জাল স্বাক্ষর ও টিপসই ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠাতা স্পন্সর আব্দুল হাদী ও এজাহার মিয়ার শেয়ার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। তাদের দাবি, বর্তমানে ওই দুটি শেয়ারের ধারক হিসেবে রয়েছেন খলিলুর রহমানের সহোদর আহমেদুল হক এবং ছেলে সেলিম রহমান। 

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা এবং মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বর্তমানে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) হিসেবে রয়েছে। ফলে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ থেকে ব্যাংক কার্যকরভাবে আয় বা মুনাফা অর্জন করতে পারছে না।

সূত্রগুলোর দাবি, এর প্রভাব ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলেও পড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। একইসঙ্গে ব্যাংকটির শ্রেণিবিন্যাসিত বিনিয়োগের হার বর্তমানে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল পর্যন্ত আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত হয় এবং নিয়মিতভাবে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদান করে আসছিল। তবে ২০০৯ সালের পর কেডিএস গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপের প্রভাব বাড়ার পরবর্তী প্রায় ১৬ বছরে ব্যাংকের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় ব্যাংকটি ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারের অবস্থানও অবনতি ঘটে। এর ফলে ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ব্যাংকটির শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়।

এ ছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের সম্প্রতি একটি বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে কেডিএস গ্রুপসংশ্লিষ্ট পরিচালক ও ব্যাংকের সাবেক কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঋণ অনুমোদন, অর্থ পাচার, মালিকানা গোপন, ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ বিতরণে অনিয়মসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়েছে। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে মূলত চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শামিম ইকবাল ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুলশান শাখা থেকে ঋণের নামে কয়েকশ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এস এম শামিম ইকবাল ও তার স্ত্রী হাসিনা ইকবাল কেডিএস গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। 

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান অতীতে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুদকের তদন্তের মুখোমুখি হন এবং পরবর্তী সময়ে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া তার জামাতা এস এম আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ ছাড়া এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগের একটি মামলায় ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত এস এম শামিম ইকবাল ও তার স্ত্রী হাসিনা ইকবালের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এ বিষয়ে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, ব্যাংক থেকে ঋণের নামে উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ দিয়ে এস এম শামিম ইকবাল কানাডার অন্টারিও প্রদেশের নর্থ ইয়র্ক এলাকায় ১৪০ কোটি টাকা দামের একটি বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করেছেন। কানাডার বিভিন্ন শহরে তাদের আরও বিলাসবহুল বাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেড ও জেকটা লিমিটেড-এর ঋণসংক্রান্ত লেনদেন তদন্ত করে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ। বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অর্থ পাচারের অভিযোগে এস এম শামিম ইকবাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তবে বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের বিষয়টি দেশের বাইরের হওয়ায় এবং তা অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার এখতিয়ারের বাইরে হওয়ায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি। 

আরেকটি অভিযোগে বলা হয়, ২০১৭ সালের শেষ দিকে এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের নামে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। পরে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হিসাবটি গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয়। ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুলশান শাখা থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রথম ধাপে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করা হয়। একইভাবে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর জেকটা লিমিটেডের নামেও গুলশান শাখায় আরেকটি চলতি হিসাব খোলা হয়।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের বিশেষ তদন্তে হিসাব খোলা ও স্থানান্তরের তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, বনানী শাখায় ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে খোলা এফএম এগ্রো ফুডসের হিসাবটি ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে বন্ধ করে একই দিন গুলশান শাখায় নতুন হিসাব খোলা হয়। এ ছাড়া ১৪ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে জেকটা লিমিটেডের নামে গুলশান শাখায় পৃথক চলতি হিসাবও খোলা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২ জুলাই ২০১৮ তারিখে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের অনুকূলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকার কম্পোজিট বিনিয়োগ সীমা অনুমোদন করা হয়। এর পাশাপাশি ডেফার্ড এলসি, বিদেশি ও স্থানীয় যন্ত্রপাতি, শিল্প স্থাপনা, পরিবহন এবং অন্যান্য খাতে অতিরিক্ত অর্থায়নেরও অনুমোদন দেওয়া হয়।

মালিকানা কাঠামো পর্যালোচনায় তদন্তে দেখা যায়, এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের অধিকাংশ শেয়ারের মালিক জেকটা লিমিটেড। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথমে জেকটা লিমিটেড প্রতিষ্ঠানটির ৮৯ শতাংশ এবং পরে ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়। অন্যদিকে, জেকটা লিমিটেডের শেয়ারের মালিকানায় এস এম শামিম ইকবালের অংশীদারত্ব শুরুতে ৫১ দশমিক ৯৪ শতাংশ থাকলেও পরবর্তী সময় শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে তা ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়। ফলে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এস এম শামিম ইকবাল পরোক্ষভাবে এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ারের কার্যকর মালিকানা ধারণ করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল সম্পাদিত একটি চুক্তি অনুযায়ী এস এম শামিম ইকবাল এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের ‘ম্যানেজিং এজেন্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের দায়িত্ব পালন করতেন। এ ছাড়া ২০২০ সালে অনুমোদিত ঋণ সুবিধার বিপরীতে তিনি ব্যক্তিগত গ্যারান্টিও প্রদান করেন। যদিও শুরুতে তার তথ্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, পরে তা হালনাগাদ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে জেকটা লিমিটেডের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে মো. মিনহাজুল হক এফএম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয়ে তদন্তে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে প্রায় ৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে শুরু হওয়া ঋণসীমা পরবর্তী বছরগুলোতে একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু ঋণের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসেনি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এফএম এগ্রো ফুডস ও জেকটা লিমিটেডের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা, মুনাফাসহ, দাঁড়িয়েছে ২১৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বিশেষ তদন্তে আরও বলা হয়েছে, চালকলের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য হংকংভিত্তিক স্পার্ক ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে এলসি খোলা হয়। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মালিকও এস এম শামিম ইকবাল ও হাসিনা ইকবাল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বাজার যাচাই প্রতিবেদন (মার্কেট ভেরিফিকেশন রিপোর্ট) এবং বাণিজ্যিক চালান (কমার্শিয়াল ইনভয়েস) ব্যাংক শাখায় সংরক্ষিত ছিল না, যা ব্যাংকিং বিধি অনুসারে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এ ছাড়া জামানতের যথেষ্ট নিরাপত্তা ছাড়াই ঋণ সুবিধা প্রদান এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনায়ও অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়, জেকটা লিমিটেডের অনুকূলে ইস্যু করা ২০ কোটি টাকার একটি ব্যাংক গ্যারান্টি পরবর্তীতে সমন্বয়ের জন্য ১৭ কোটি টাকার ‘ফোর্সড লোন’ সৃষ্টি করতে হয়। একইসঙ্গে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির বাজারমূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্যও তদন্তে উঠে এসেছে। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক   বিতর্কিত   নতুন পর্ষদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close