মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর: ডা. জাহেদ      শারমিন হত্যা মামলায় পিবিআইয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য      সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের দুটি প্যাকেজ ঘোষণা      বিশ্বে ২৯ মিলিয়ন শিশু এখনও হামের টিকার সুরক্ষার বাইরে      আ.লীগের সাজাপ্রাপ্তদের ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার      কাঁপছে দিল্লির মসনদ      যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খাদ্যের গল্প, ভোক্তার আস্থা
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:০০ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প আজ আর শুধু উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভোক্তাকেন্দ্রিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। গত দুই দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও ক্রয় আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে বাজারে যাওয়া মানেই ছিল পরিচিত দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনা, আজ সেখানে ভোক্তা পণ্যের গুণগত মান, নিরাপত্তা, পুষ্টিগুণ, ব্র্যান্ডের সুনাম, অনলাইন রিভিউ, এমনকি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য বিপণনও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

খাদ্য বিপণন বলতে শুধু বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় বাড়ানোর কৌশলকে বোঝায় না। এটি এমন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হয়। বাজার গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন, মূল্য নির্ধারণ, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং, প্রচার, বিতরণ এবং বিক্রয়োত্তর গ্রাহকসেবা সবকিছুই খাদ্য বিপণনের অংশ। সফল খাদ্য বিপণনের মূল ভিত্তি হলো ভোক্তার চাহিদা ও মনস্তত্ত্বকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী পণ্য ও বার্তা তৈরি করা।

বাংলাদেশে খাদ্য বিপণনের যাত্রা ছিল বেশ সরল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে দেশের অধিকাংশ খাদ্যপণ্য স্থানীয় হাট-বাজার ও ছোট মুদি দোকানের মাধ্যমে বিক্রি হতো। তখন ব্র্যান্ডের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত পণ্যের প্রাপ্যতা ও দাম। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমও ছিল সীমিত রেডিও, সংবাদপত্র কিংবা দেয়াললিখন। নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, শিল্পায়ন এবং টেলিভিশনের বিস্তারের মাধ্যমে খাদ্যশিল্পে নতুন যুগের সূচনা হয়। প্রাণ, এসিআই, স্কয়ার, আকিজ, সিটি গ্রুপসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপন কৌশল গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের প্রসার খাদ্য বিপণনে ডিজিটাল বিপ্লব ঘটায়। বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এগুলো খাদ্যপণ্য প্রচারের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশের ভোক্তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তিনি শুধু সুস্বাদু খাবার চান না; জানতে চান সেটি কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিবেশ ও সমাজের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল। ফলে খাদ্য বিপণনে ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, যদি পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই ব্র্যান্ডের প্রতি ভোক্তার আস্থা দ্রুত কমে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের কাঁচামাল কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকির বিভিন্ন ঘটনা ভোক্তাদের আরও সতর্ক করে তুলেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ভালো পণ্য তৈরি করলেই চলবে না; সেই পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যও তুলে ধরতে হবে।

খাদ্য বিপণনে প্যাকেজিং এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। আগে প্যাকেটের মূল কাজ ছিল পণ্য সংরক্ষণ করা, কিন্তু এখন সেটিই অনেক সময় ভোক্তার প্রথম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আকর্ষণীয় নকশা, স্পষ্ট তথ্য, পুষ্টিগুণের বিবরণ, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, হালাল সনদ এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ একটি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত ভোক্তারা এখন প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্য পড়েই অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

ডিজিটাল বিপণন বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বর্তমানে একটি নতুন খাদ্যপণ্য বাজারে আনার আগে প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্রহ সৃষ্টি করে, ভিডিও তৈরি করে, জনপ্রিয় ফুড ব্লগার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে রিভিউ প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন অনলাইন প্রচারণা চালায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় একটি জনপ্রিয় ভিডিও বা একটি ভাইরাল রিভিউ একটি নতুন খাদ্যপণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। একইসঙ্গে ফুডপান্ডা, চালডাল, মীনাবাজার অনলাইনসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম খাদ্য বিপণনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

তবে ডিজিটাল বিপণনের পাশাপাশি বাজার গবেষণার গুরুত্বও কমেনি; বরং আরও বেড়েছে। কোন অঞ্চলের মানুষ কী ধরনের খাবার পছন্দ করেন, কোন মৌসুমে কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কোন বয়সের মানুষের খাদ্যাভ্যাস কী এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিপণন পরিকল্পনা তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং গ্রাহকের ক্রয় ইতিহাস বিশ্লেষণ করে এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিপণনের যুগ শুরু হয়েছে। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের দুইজন গ্রাহকও ভিন্ন ভিন্ন অফার বা বিজ্ঞাপন দেখতে পারেন।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসচেতনতার বৃদ্ধি খাদ্য বিপণনে নতুন প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। জৈব খাদ্য, কম চিনি, কম চর্বি, উচ্চ আঁশযুক্ত খাদ্য, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের বিজ্ঞাপনে শুধু স্বাদের কথা বলছে না; বরং পণ্যের পুষ্টিগুণ, নিরাপদ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়টিও তুলে ধরছে। একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং এবং স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের মতো বিষয়ও ব্র্যান্ডের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পে প্রাণ, এসিআই, আকিজ, স্কয়ারসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সফল বিপণন কৌশলের মাধ্যমে শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোকাকোলার ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা, ওরিওর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সৃজনশীলতা, চিপোটলের নৈতিক উৎপাদন বার্তা কিংবা সাবওয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক অবস্থান দেখিয়েছে যে, আধুনিক খাদ্য বিপণনে শুধু বিজ্ঞাপন নয়; বরং একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড দর্শনই দীর্ঘমেয়াদি সফলতার ভিত্তি।

তবে বাংলাদেশের খাদ্য বিপণনের সামনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাদ্যে ভেজাল, মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, শীতলীকরণ অবকাঠামোর ঘাটতি, বিভ্রান্তিকর অনলাইন প্রচারণা এবং তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এখনো বড় বাধা। একইসঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের অতিরিক্ত প্রচারণা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। তাই ব্যবসায়িক মুনাফার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

আগামী দিনের খাদ্য বিপণন হবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অগমেন্টেড রিয়েলিটি (অজ), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ঠজ), স্মার্ট প্যাকেজিং এবং ই-কমার্সের বিস্তার খাদ্য শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি ভোক্তার আস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একটি ব্র্যান্ডের প্রকৃত শক্তি শুধু তার বিক্রয় পরিসংখ্যানে নয়, বরং মানুষের বিশ্বাসে নিহিত।

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গবেষণা, উদ্ভাবন, গুণগত মান, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং নৈতিক বিপণনকে সমান গুরুত্ব দেয়, তবে শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও তারা আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। খাদ্য বিপণনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু ব্যবসার প্রসারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নিরাপদ খাদ্য, সচেতন ভোক্তা এবং একটি টেকসই অর্থনীতি গঠনেরও অন্যতম চালিকাশক্তি।

লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, ইউকে

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close