গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের ১৬ বছরের আইনগত পাওনা পরিশোধ, শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ, শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার সংরক্ষণ ও বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এর যথাযথ বাস্তবায়নের দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন ও মৌন মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকাল ৪টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে গ্রামীণফোন পাঁচ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা মৌন মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
মানববন্ধনে গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকরা গত ১৬ বছর ধরে তাদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।’
তাদের দাবি, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এর ধারা ২৩৪, ২৪০ (৩) ও সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে বিলম্বজনিত আইনগত পাওনার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তবে, দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতার পরিবর্তে একটি বাস্তবসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সমাধানের স্বার্থে আন্দোলনকারীরা সমঝোতার ভিত্তিতে কর পরিশোধের পর প্রত্যেকের জন্য ১০ কোটি টাকা গ্রহণের প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।
তাদের মতে, এ ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কর রাজস্ব অর্জন করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের বিরোধেরও একটি গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি সম্ভব হতে পারে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত ১৯ মাস ধরে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সারাদেশে আন্দোলন পরিচালিত হলেও এখনো কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। বরং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, হয়রানিমূলক মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যা শ্রমিকদের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী।
মানববন্ধনে রিট পিটিশন নম্বর ৮৪৬৪/২০২৬ প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনগত পাওনা নিষ্পত্তির আগেই দায়ের হওয়া এ রিট বাংলাদেশের শ্রমিকদের অর্জিত আইনগত অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।’
বক্তারা আরও বলেন, ‘রিটের আবেদনকারীদের একজন গ্রামীণফোনের হেড অব ইন্ডাস্ট্রি রিলেশনস (আইআর) এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মরত কর্মকর্তা, সম্ভাব্য ডাব্লিউপিপিএফ/ডাব্লিউডাব্লিউএফ সুবিধাভোগী ও শেয়ারহোল্ডার।’
তাদের মতে, রিটে তিনি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে নিজের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট তহবিলের সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হওয়ায় বিষয়টি সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে কি না, তা আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি ওই রিটের ফলে ডাব্লিউপিপিএফ/ডাব্লিউডাব্লিউএফ সংক্রান্ত অর্জিত অধিকার, ৫ শতাংশ মুনাফাভিত্তিক অংশগ্রহণ বা বিলম্বজনিত আইনগত পাওনার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন বা সীমাবদ্ধতা আসে, তবে এর প্রভাব শুধু গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ওপর নয়, দেশের বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমিকদের আইনগত অধিকারেও পড়তে পারে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রম আইন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়; বরং দেশের সকল শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার, সুরক্ষা, অংশগ্রহণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। তাই শ্রমিকদের অর্জিত আইনগত অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়।’
মানববন্ধন থেকে গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের আইনগত পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তি, শ্রমিক নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ, শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, রিট পিটিশন নম্বর ৮৪৬৪/২০২৬’-এর সম্ভাব্য প্রভাব শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার ও জাতীয় শ্রমনীতির ওপর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা এবং শ্রমিকদের আইনগত অধিকার সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে একটি ন্যায়সঙ্গত, আইনসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
কেকে/এমএ