শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: যে খাবারে জীবন বাঁচে সেই খাবারেই মৃত্যু      মক্কায় সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৩ প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত      শুক্রবার ভারতজুড়ে বিক্ষোভের ডাক সিজেপির, উত্তাল পরিস্থিতি      হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      পদত্যাগের আভাস রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নিয়মিত বাজার তদারকির অভাব
যে খাবারে জীবন বাঁচে সেই খাবারেই মৃত্যু
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:১২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

জীবন বাঁচাতে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। জীবন সুন্দর রাখতে ব্যবহার করি নানা ধরনের পণ্য। কিন্তু সেইসব পণ্য বা খাবারের নামে নীরবেই আমরা সেবন করছি অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক, ভেজাল উপাদান ও ক্ষতিকর রঙমিশ্রিত দ্রব্য। এসব খাবার তালিকার প্রথম দিকে থাকে অতিরিক্ত কেমিক্যালমিশ্রিত খাবার, নকল পানীয় এবং অস্বাস্থ্যকর বেকারি পণ্য। এতে প্রথমে হালকা সমস্যা যেমন পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন খেলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। চিকিৎসা নিতে নিঃস্ব হতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে। এমন অবস্থার মধ্যেই সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি চারটি প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

থামানো যাচ্ছে না ফরমালিনের দৌরাত্ম্য: দেশের সর্বত্রই ফরমালিনযুক্ত খাবারে ঠাসা। কিছুতেই ফরমালিন নামের এই বিষের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। ফলমূল, মাছ, মাংস ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালানো হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না নকল-ভেজালের দুষ্কর্ম থেকে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে রাজধানীতে গড়ে উঠছে একের পর এক ফরমালিনমুক্ত বাজার। বলা হচ্ছে প্রতিটি পণ্য পরীক্ষা করে এসব বাজারে ঢোকানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তথাকথিত ফরমালিনমুক্ত বাজারেও রাসায়নিকমিশ্রিত পণ্যের বেচাকেনা চলছে অবাধে। 

দেহের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিদিন শাকসবজি, ফলমূলসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা খুব জরুরি। কিন্তু ফসল নির্বাচন, উৎপাদন, উত্তোলন বা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ইত্যাদি যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই আমাদেরকে নানা ভাবে জিম্মি করে রেখেছে। কিন্ত আমরা খাবারের নামে প্রতিদিনই প্রায় বিষ খেয়ে চলেছি। কারণ শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষি খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত হাতবদলের নানা পর্যায়ে মেশানো হচ্ছে হরমোনসহ নানা রকম বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার।

বাড়ছে ভয়ঙ্কর রোগব্যাধি, অকালে ঝরছে প্রাণ: এতে করে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেলিউর, হাঁপানি, ক্ষুধামন্দা, খাবারে অরুচি, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, খাদ্য বিষক্রিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বৃহদান্ত ও ক্ষুদ্রান্তে প্রদাহসহ গর্ভবতী মায়ের শারীরিক নানা জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সৃষ্টি জন্ম নিচ্ছে। এসব বিষাক্ত খাবারে বড়দের চাইতে শিশু ও বৃদ্ধদের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি অকালে মৃত্যুর পথে ঢলে পরছে অসংখ্য তরতাজা প্রাণ। 

মানহীন আট পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ: সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় চার প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’ (বিএসটিআই)।

সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি রয়েছে পণ্যগুলোতে। তাই জনস্বার্থ ও ভোক্তা সুরক্ষার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ওইসব পণ্যের উৎপাদন, বিক্রয় ও বিতরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি, ওই পণ্যগুলোকে বাজার থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

যে চার কোম্পানির পণ্য এই তালিকায় আছে, সেগুলো হলো- ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেস, কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড, ডেকো ফুডস লিমিটেড। এসব কোম্পানির জুস, শ্যাম্পু, আইসক্রিম, লোশনসহ আট ধরনের পণ্যের জন্য এই নির্দেশনা এসেছে। এর আগে, গত সপ্তাহেও মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিন ধরনের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিল বিএসটিআই। ২০১৯ সালে বহুল বিক্রিত কয়েকটি ব্রান্ডের লবণ, মসলা এবং তেলসহ ৫২ ধরনের পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। বিএসটিআই নিয়মিত এরকম বিভিন্ন পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। তবে প্রতিবারই একটি প্রশ্ন সামনে আসে, অনুমোদন পাওয়ার পরও কীভাবে কোনো পণ্য মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়? আর সেই সঙ্গে বাজারে থাকা একই ধরনের বাকি পণ্যগুলোর তাহলে কী অবস্থা?

বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন, কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে না নিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে বিএসটিআই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ডসহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিএসটিআইর মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান নয়। বরং নিয়মিত বাজার তদারকির অংশ হিসেবে এলোমেলোভাবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বাজারে থাকা অন্য পণ্যগুলো নিরাপদ কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় থাকা স্বাভাবিক। কিছু উৎপাদক ও সরবরাহকারীর অনিয়মের কারণে সেই আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

বিএসটিআই জানিয়েছে, তাদের নিয়মিত নমুনা পরীক্ষায় অকৃতকার্য পণ্যগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যানপত্র দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিরাপদ খাদ্য বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে: এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এখন মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে। সুস্থ ও সন্দুরভাবে বাঁচতে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে শুধু অভিযানেই নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এজন্য সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সব ধরনের মানুষকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে দেশে নিরাপদ খাদ্য ফিরে আসবে।

ভেজাল খাবার কী ও কেন বিপজ্জনক: ভেজাল খাবার বলতে এমন খাবারকে বোঝায়, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর বা নিম্নমানের উপাদান মেশানো হয়। যেমন- ফল দ্রুত পাকাতে কার্বাইডের ব্যবহার, দুধে পানি বা ডিটারজেন্ট মেশানো, মসলায় রং বা ইটের গুঁড়া মেশানো ইত্যাদি। এসব ভেজাল শুধু খাবারের গুণগত মান নষ্ট করে না, বরং শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।

স্বাস্থ্যের ওপর ভেজাল খাবারের প্রভাব: চিকিৎসকদের মতে, খাবারে মেশানো রাসায়নিক উপাদানগুলো মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ধীরে ধীরে বিকল করে দেয়। খাদ্যে ভেজাল হিসেবে সাধারণত ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, টেক্সটাইল ডাই, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, ভেজাল খাবারের ক্ষতি অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তাই মানুষ শুরুতে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু নিয়মিত এসব খাবার খেলে শরীরে বিষ জমতে থাকে, যা পরবর্তীতে জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্য নির্বাচনে সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

সচেতনতাই প্রধান প্রতিরোধ: সরকারের কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি ব্যক্তিগত পর্যায়ের সচেতনতাও অপরিহার্য। চিকিৎসকরা বাজারের চকচকে ও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  খাবার   মৃত্যু  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close