শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে কিছু জানি না: স্পিকার      টানা বৃষ্টিতে বাড়ল সবজির দাম      গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী      রাজধানীতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, দগ্ধ একই পরিবারের দুজনের মৃত্যু      ফ্যাসিবাদমুক্ত বঙ্গভবন, পদত্যাগ করছেন চুপ্পু      যে খাবারে জীবন বাঁচে সেই খাবারেই মৃত্যু      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দখলে হুমকির মুখে গাজীপুরের বনাঞ্চল
তানজেরুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১:২০ পিএম
চন্দ্রায় বনে নির্মাণাধীন রাস্তা ও চন্দ্রা বিট অফিসার মো. ইকবাল হোসেন।

চন্দ্রায় বনে নির্মাণাধীন রাস্তা ও চন্দ্রা বিট অফিসার মো. ইকবাল হোসেন।

বন অধিদপ্তরে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মধ্য বন দখলের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বন বিভাগের চন্দ্রা বিটের বনাঞ্চল। বিটটি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় অবস্থিত। দৈনিক খোলা কাগজের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে চন্দ্রা বিটে বন বিভাগের প্রত্যক্ষ যোগসাজসে বন দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। 

চন্দ্রা বিট অফিসার মো. ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বিটের চারজন কর্মচারির সম্পৃক্ততায় দীর্ঘদিন ধরে চন্দ্রায় বনভূমি দখল করে আসছে ভূমিদস্যুরা। ফলে বন দখল প্রতিরোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশনা মাঠ পর্যায় উপেক্ষিত হচ্ছে। এভাবে বন দখল চলতে থাকলে চন্দ্রার বনাঞ্চল ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সচেতন মহল। 

বন বিভাগের নথিতে চন্দ্রা বিটের অধীন ১৯টি মৌজায় বনভূমি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার একর। তবে স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও অধিবাসীদের মতে, চন্দ্রায় অর্ধেকের বেশি বনভূমি দখল হয়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চন্দ্রা বিটের অধীন বনাঞ্চলে তিন হাজারের বেশি ঘরবাড়ি, দোকান, ঝুট গুদাম, অটোরিকশা গ্যারেজ, বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠে। ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন চন্দ্রা বিট অফিসার আবদুল মান্নান প্রাথমিক পর্যায়ে ৮শ বন দখকারীর নামের তালিকা প্রস্তুত করেন। তালিকা প্রস্তুত চলমান অবস্থায় ওই বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে আবদুল মান্নানকে চন্দ্রা বিট থেকে বদলি করা হয়। চন্দ্রা বিটের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় পার্শ্ববর্তী মৌচাক বিট কর্মকর্তা সায়ফুল বারীকে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর মো. ইকবাল হোসেন চন্দ্রা বিট কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিনি যোগদানের পর চন্দ্রা বিটে সমসাময়িক জবরদখল তালিকায় প্রায় ১৪শ বন দখলকারীর নাম উঠে আসে। এ সময় তিনি ঘুষের বিনিময়ে শত শত বন দখলকারীর নাম ও বেহাত হওয়া বনভূমির পরিমাণের তথ্য গোপন করেন। পরবর্তীতে চন্দ্রায় জবরদখল তালিকা প্রস্তুত ও বন দখল প্রতিরোধের পরিবর্তে বন দখলে সহযোগিয়ায় মরিয়া হয়ে উঠেন এই কর্মকর্তা। চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের কর্মকালীন সময়ে গত বছরের ৩০ মার্চ চন্দ্রা বিটের বনাঞ্চলে মাত্র একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে ৫.৭০ একর বনভূমি উদ্ধারের দাবি করে বন বিভাগ।
অভিযানে চন্দ্রা বিটের ৪২৬ নম্বর সিনাবহ মৌজায় ১৫৪ নম্বর সিএস দাগ থেকে সৃষ্ট ২৭৯ নম্বর আরএস দাগে ৩ একর বনভূমি দখল থেকে উদ্ধার করা হয়। একই দিন ৩৫৮ নম্বর বাগাম্বর মৌজার সিএস ৯৯ নম্বর দাগের আরএস ১৭০ নম্বর দাগে ২.৭০ একর বনভূমি দখল থেকে উদ্ধার করা হয়।

অনুসন্ধান বলছে, গত ১৯ মাস ধরে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন মো. ইকবাল হোসেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর চন্দ্রা বিটের ১৯টি মৌজার বন দালালদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বন দালালদের বন দখলের প্রস্তাবনার প্রাথমিক তদন্ত ও দখলের সুযোগ করে দেয়ার জন্য চন্দ্রা বিটের কয়েকজন কর্মচারিদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সিন্ডিকেট। কর্মচারি সিন্ডিকেটের প্রধান নৌকা চালক মিনহাজ উদ্দিন দেওয়ান। অথচ চন্দ্রা বিটের বনাঞ্চলে নৌকা চালানোর মতো নদী, খাল-বিল নেই। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন, ফরেস্ট গার্ড এনামুল হক, লুৎফর রহমান এবং আব্দুল লতিফ।

চন্দ্রা বিটের কর্মচারিদের এই সিন্ডিকেট বন দখলের সুযোগ করে দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে ঘুষের টাকা সংগ্রহ, বন দালাল ও নামধারী সাংবাদিকদের ঘুষের ভাগ প্রদানসহ বন দখলকারীদের সহায়তা করতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য আদান প্রদান করে থাকে। গত কয়েকমাস আগে টাঙ্গাইল বন বিভাগ থেকে বদলী হয়ে ঢাকা বন বিভাগে যোগদান করে ওই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য বনে যান লুৎফর রহমান।

চন্দ্রা বিটের খন্দকার পাড়ায় পৃথক স্থানে বনে চারটি স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলছে। ওই চারটি স্থাপনা থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা ও তার অধস্তন কর্মচারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সুরিরচালা মৌজায় সীমানা নির্ধারণ না করে বন দখলের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আনোয়ার নামে এক ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণ করছেন। চন্দ্রা বিট অফিসের কর্মচারী সিন্ডিকেট লোক দেখানো জমি পরিমাপ করে বন দখল হবে না এমন অজুহাতে ওই ব্যক্তিকে বাড়ি নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। এ ঘটনায় দুই দফায় চন্দ্রা বিট অফিসার হাতিয়ে নেন ৫ লাখ টাকা। 

এ ছাড়া ভুলুয়া মৌজায় শাকিল নামে এক ব্যক্তির আধাপাকা বাড়ি বিগত দিনে উচ্ছেদ করা হয়। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় চন্দ্রা বিটে চার লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পুনরায় তিনি নির্মাণ কাজ চালাচ্ছেন। খন্দকার পাড়ায় সাহিদা নামে এক নারী চন্দ্রা বিট অফিসে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে বনে বাড়ি নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছেন। পালানপাড় মোড়ে জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক ব্যক্তি বনে তিন কক্ষের বাড়ি করেছেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে। সুরিরচালা এলাকায় সাঈদ নামে এক ব্যক্তি ৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে বনে বাড়ি করেছেন। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসংলগ্ন বন দখলকারী চারটি ঝুটের গুদামের রাস্তা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে চলতি মাসে ৭ লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধান আরো বলছে, চন্দ্রা টাওয়েল টেক্স লিমিটেড কারখানার সন্নিকটে সংরক্ষিত বনে আকাশমনী বাগানের গাছ কেটে গত বছরের ১৩ মার্চ রাস্তা নির্মাণ চেষ্টা চালায় একটি চক্র। এ ঘটনায় চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বিটের কর্মচারিরা বন অপরাধে হাতেনাতে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর (পিওআর নম্বর ৩৫/চন্দ্রা অব ২০২৪-২৫, তারিখ: ১৩ মার্চ ২০২৫) আদালতে সোপর্দ করে। বনে রাস্তা প্রতিহত করতে সেখানে ১৪২টি বিভিন্ন জাতের চারাগাছ রোপণ করে চন্দ্রা বিটের কর্মচারিরা। 

তবে কারাগার থেকে জামিনে এসে ওই ব্যক্তি পুনরায় অসমাপ্ত রাস্তাটির কাজ সমাপ্ত করতে চন্দ্রা বিট অফিসার মো. ইকবাল হোসেনকে দুই লাখ টাকা ঘুষ দেন। বন মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকী বন বিভাগের হাতে গ্রেপ্তারের সময় রাস্তাটি মাটির থাকলেও বর্তমানে ইটের খোয়া বিছিয়ে পিচ ঢালাই করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। উপড়ে ফেলা হয়েছে ১৪২টি চারাগাছ।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে চন্দ্রা বিট অফিসার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, তিনি জবরদখলের সাথে সম্পৃক্ত নন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সঠিক নয়।

কালিয়াকৈর রেঞ্জ অফিসার (এসিএফ) মো. শহিদুল হাসান শাকিল বলেন, চন্দ্রা বিটের ব্যাপারে তিনি বিব্রত। চন্দ্রা টাওয়েল টেক্সকারখানাসংলগ্ন রাস্তার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিলো। রাস্তার কাজ পুনরায় কিভাবে চালু হলো তিনি জানেন না। এ ব্যাপারে বিট অফিসার তাকে কিছু জানাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  দখল   হুমকি   গাজীপুর বনাঞ্চল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close