চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছোট ছিলোনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম সাইক্লোন সেন্টারের (দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল মাত্র দুই বছরে। কিন্তু কাজ শুরুর ছয় বছর পার হলেও প্রকল্পটির মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকট, গাফিলতি এবং বর্তমানে কার্যত লাপাত্তা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এতে একদিকে শতাধিক শিক্ষার্থী অস্থায়ী টিনশেডে পাঠদান করতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয় প্রকল্পের (এমডিএসপি) আওতায় প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়-কাম সাইক্লোন সেন্টার (দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২০ সালের ২৯ মার্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২৪ মাস। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অর্থসংকট ও চরম গাফিলতির কারণে নির্মাণকাজ বারবার বন্ধ হয়ে যায়। দুই থেকে তিন দফা সময় বাড়িয়েও তারা কাজ শেষ করতে পারেনি। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চলমান কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে নতুন করে কবে নির্মাণকাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেনি উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজের প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে উন্মুক্ত রডে মরিচা ধরেছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে জন্মেছে আগাছা। অবহেলায় পড়ে থাকা প্রকল্পটির এমন বেহাল দশা যে, ভবনের চারপাশে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের দাবি, রডে মরিচা পড়লেও সেগুলো এখনো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়নি।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, পুরোনো ভবন ২০১৯ সালে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকে বিদ্যালয়ের জমিদাতার বাড়ির আঙিনায় বেড়া দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী টিনশেডে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে আসছে কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মোস্তফা এরশাদ বলেন, ‘ভবন ভাঙার পর থেকেই টিনশেডে ক্লাস নিচ্ছি। শতাধিক শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে দিন দিন শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। অস্থায়ী টিনশেডে পাঠদান চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। অফিসের আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে চায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্ভোগের বিষয়টি জানানো হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজে চরম অবহেলা দেখিয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় ছিলোনিয়া গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি ওঠে। কিন্তু নির্মাণাধীন সাইক্লোন সেন্টারের কাজ শেষ না হওয়ায় সেটি কোনো কাজে আসেনি। আশ্রয়কেন্দ্রটি চালু থাকলে দুর্যোগকালে মানুষের এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক আমিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ ছাড়া অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড কর্তৃপক্ষের মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী জুনায়েদ আবছার চৌধুরী বলেন, “প্রকল্পটির পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ও নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।”
দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ঝুলে থাকা এই বিদ্যালয়-কাম সাইক্লোন সেন্টার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিনশেডে পাঠদান করতে হচ্ছে এবং দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের সুবিধা পাচ্ছে না। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দ্রুত পুনরায় দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
কেকে/এলএ