প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশ ও সৃজনশীলতার এক অনন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক ‘তামাশা সংস্কৃতি’র জন্ম দিয়েছে; যা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামুন, লায়লা, মোহনা, লিখন ও মেহেদীসহ কয়েকজন আলোচিত কনটেন্ট নির্মাতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, লাইভে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা ওআইনি প্রক্রিয়া নিয়ে অসংখ্য ভিডিও ও কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে মুশতাক ও তিশাকে ঘিরেও ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ ও কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। ঘটনাগুলোর প্রকৃতি ভিন্ন হলেও একটি বিষয় অভিন্ন—ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে এনে তা দর্শক আকর্ষণ ও ডিজিটাল আলোচনার উপকরণে পরিণত করা।
একইভাবে হিরো আলম দীর্ঘদিন ধরে গান, অভিনয় ও বিভিন্ন ধরনের ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে আলোচনায় রয়েছেন। তার কিছু কনটেন্টের ধরন নিয়েও সমাজে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। এসব ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং অনেকের কাছে তা বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে।
এখানে ব্যক্তির চেয়ে বড় বিষয় হলো—এই প্রবণতা। আজ কার সঙ্গে কার সম্পর্ক ভাঙল, কে কাকে নিয়ে লাইভ করল, কে কাকে অপমান করল, কার বিরুদ্ধে মামলা হলো কিংবা কে কাকে জবাব দিল—এসব বিষয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে। ব্যক্তিগত জীবনের সংকটকে কনটেন্টে রূপ দেওয়া এখন এক ধরনের ডিজিটাল ব্যবস পরিণত হচ্ছে। অ্যালগরিদমও এমন কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, কারণ বিতর্ক মানুষের কৌতূহল বাড়ায়।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কিশোর ও তরুণ সমাজের ওপর। তারা এমন একটি বাস্তবতা দেখছে, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি কিংবা মানবসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক অনেক বেশি দর্শক, অনুসারী ও অর্থ এনে দিচ্ছে। এতে তাদের একটি অংশের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে যে, পরিচিতি অর্জনের সহজ পথ হলো বিতর্ক সৃষ্টি করা, ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে এনে দর্শক টানা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া।
এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সমাজে পারিবারিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত সংকট এখন সহানুভূতির বিষয় না হয়ে বিনোদনের পণ্যে পরিণত হচ্ছে। এটি একটি সুস্থ সমাজের জন্য মোটেও ইতিবাচক লক্ষণ নয়।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সংরক্ষিত থাকতে হবে; তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মানহানি, অশোভন কনটেন্ট ও সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টিকারী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নৈতিকতা ও গণমাধ্যম-সচেতনতা বিষয়ে শিক্ষা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়ে যারা মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উৎসাহিত করতে হবে। সুস্থ কনটেন্ট যত বেশি সামনে আসবে, ততই অপসংস্কৃতির বাজার সংকুচিত হবে।
তবে কেবল রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই চলবে না। দর্শক হিসেবে আমাদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা যখন কৌতূহলবশত এসব ভিডিও দেখি, শেয়ার করি, মন্তব্য করি কিংবা বিতর্ককে আরও ছড়িয়ে দিই, তখন অজান্তেই এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখি। দর্শক না থাকলে এমন কনটেন্টের বাজারও থাকবে না। তাই ক্ষতিকর কনটেন্ট এড়িয়ে চলা, রিপোর্ট করা এবং ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক কনটেন্টকে সমর্থন করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, রুচি ও মূল্যবোধের ওপর। যদি আমরা কেলেঙ্কারিকে বিনোদন ও ব্যক্তিগত সংকটকে ব্যবসায়ে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে ভুল সামাজিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখনই সময় রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, গণমাধ্যম ও প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে—তামাশা, কুরুচি ও ব্যক্তিগত সংকটের বাজার নয়। সুস্থ ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলার এই দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এমএ